বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনার আগুন ছড়িয়ে পড়ায় শুক্রবার বড় ধাক্কা খেয়েছে বৈশ্বিক অর্থবাজার। ইরানের ওপর ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই একদিকে শেয়ারবাজারে ধস, অন্যদিকে দ্রুত বেড়ে যায় অপরিশোধিত তেলের দাম। আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকে পড়েছেন সোনা, সুইস ফ্রাঁ ও জাপানি ইয়েনের দিকে।
শুক্রবার ভোরে এশিয়ান বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন স্টক ফিউচার সূচক ব্যাপক পতনের মুখে পড়ে। গ্রিনিচ মান সময় ০০:৫৫ নাগাদ এসঅ্যান্ডপি ই-মিনি ফিউচার পড়ে ১.৫ শতাংশ এবং প্রযুক্তিভিত্তিক নাসডাক ফিউচার পড়ে ১.৭ শতাংশ। একই সময়ে জাপানের নিক্কেই সূচক কমে ১.৪ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক হারায় ১.২ শতাংশ।
অপরদিকে জ্বালানি বাজারে দেখা দেয় তীব্র অস্থিরতা। প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক লাফে বেড়ে ৬ শতাংশেরও বেশি হারে ৭৩.৫৬ ডলারে পৌঁছায়। স্বর্ণের দামও বাড়ে ১ শতাংশ, প্রতি আউন্সে তা ছুঁয়ে ফেলে ৩,৪১৯ ডলার—যা চলতি মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে রুখতেই তারা এ হামলাকে ‘পূর্বসতর্কতামূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে চালিয়েছে। এ হামলার জবাবে ইরান যেকোনো সময় পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালাতে পারে, এমন আশঙ্কায় ইসরায়েলে জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা নূর নিউজ জানিয়েছে, শুক্রবার ভোরে রাজধানী তেহরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। হামলার খবর নিশ্চিত করেছে পশ্চিমা গণমাধ্যমও। রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের দুইজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই হামলা চালিয়েছে এককভাবে, এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। সিএনএন জানিয়েছে, এ নিয়ে হোয়াইট হাউজে একটি জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠক ডাকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
টরন্টোভিত্তিক করপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক কার্ল শামোত্তা বলেন, “ইরানে হামলার খবরে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে পালাচ্ছেন। তবে হামলার মাত্রা বা পরিসর এখনো স্পষ্ট না হওয়ায় বাজারে পুরোপুরি আতঙ্ক দেখা যায়নি।”
তিনি আরও বলেন, “মূল আতঙ্কের জায়গা হলো, এই হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন সংঘাতের দ্বার খুলে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বিনিয়োগ চিত্রে।”
মুদ্রাবাজারেও এই উত্তেজনার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে। নিরাপদ মুদ্রা হিসেবে পরিচিত সুইস ফ্রাঁর দাম বেড়ে ডলারের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে ০.৮০৭২, যা ০.৪ শতাংশ বৃদ্ধি। জাপানি ইয়েনের দাম বেড়েছে ০.৩ শতাংশ, যার ফলে এক ডলার লেনদেন হয়েছে ১৪৩.০৬ ইয়েনে। ইউরো তুলনামূলক দুর্বল হয়ে ০.৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১.১৫৫৩ ডলারে।
মার্কিন ডলার সূচক, যা ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের অবস্থান নির্ধারণ করে, তা ০.৪ শতাংশ বেড়ে গিয়ে ঠেকেছে ৯৮.০৭-এ।
অস্ট্রেলিয়ান ও নিউজিল্যান্ড ডলারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ মুদ্রাগুলো ০.৯ শতাংশ পর্যন্ত দর হারিয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, কয়েকদিন আগেও যেখানে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য বিরতি ও প্রত্যাশার চেয়ে কম মুদ্রাস্ফীতির কারণে ডলার কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল, সেখানে এখন নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আবারও শক্তি ফিরে পেয়েছে ডলার।
এদিকে, বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা তীব্র করেছে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাঘাতের সম্ভাবনা। ফলে শুধু শুক্রবারের লেনদেনে তেলের দর বেড়েছে প্রায় ৪ ডলার। সোনার দামও বেড়ে ০.৮ শতাংশে পৌঁছেছে—মে মাসের প্রথম দিকের পর যা সর্বোচ্চ।
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থির এই ছবির পরিণতি এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার পরবর্তী ধাপের ওপর। বাজারদর্শীরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন নিরাপদ ও স্থিতিশীল পুঁজিতে বিনিয়োগে। যুদ্ধের উত্তাপ বাড়লে স্বর্ণ ও নিরাপদ মুদ্রায় বিনিয়োগের ঝোঁক আরও বাড়বে—এমনটি ধারণা করছেন অনেকেই।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলা
ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের আশঙ্কা