বিদ্রুপের শিকার বাভুমার হাতেই এখন টেস্ট সেরার দন্ড

যার চারপাশে ছিল কেবল সংশয়, যার পরিচয়ে ছিল কেবল ছায়া—তিনি আজ আলো। ট্রলের তীরে জর্জরিত সেই মুখটাই এখন প্রোটিয়াদের জয়মাল্য ধারণ করছে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের রূপালি মুকুট আজ টেম্বা বাভুমার মাথায়। আর দক্ষিণ আফ্রিকা? বহুদিনের প্রতীক্ষায় পাওয়া শিরোপা বুকে জড়িয়ে বলছে—আমরা আর চোকার্স নই। যেখানে আড়ালের নায়ক সেই টেম্বা বাভুমাই। যাকে নিয়ে নেটিজেনরা সামাজিক মাধ্যমে ট্রল আর মিম ছড়াতেন সর্বদা।

দীর্ঘদিন ‘চোকার্স’ তকমা ঘাড়ে নিয়ে ঘুরেছে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট। বারবার আইসিসি ইভেন্টে হোঁচট খাওয়ার পর অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন—এই দল বুঝি বড় মঞ্চে পারেই না। আর সেই ভাবনার চূড়ান্ত জবাব এলো এবারের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে, যেখানে টেম্বা বাভুমার নেতৃত্বে প্রোটিয়ারা লিখেছে নতুন ইতিহাস। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম পূর্ণাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গ টেস্ট অধিনায়ক হয়ে যিনি একদিন ছিলেন ট্রলের শিকার, তিনিই আজ দেশের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক।

জোহানেসবার্গের অখ্যাত এক পাড়ার মাঠ থেকে উঠে আসা ছোট্ট ছেলেটিকে নিয়ে কেউ কখনও ভাবেনি একদিন দেশের ক্রিকেটের ধ্রুবতারা হবে। কৃষ্ণাঙ্গ বলেই যেন সবসময় তাকে আলাদা চোখে দেখা হতো। ‘কোটার খেলোয়াড়’, ‘যোগ্যতার অভাব’—এসব শব্দ বাভুমার জীবনের দৈনন্দিন উপহাসে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্য যাদের বাঁকে বাঁকে কঠিন করে তোলে, তাদেরই মন নাকি হয়ে ওঠে পাথরের মতো দৃঢ়। সেই মনেই গড়ে উঠেছিল এক অবিচল প্রতিজ্ঞা—নিজেকে প্রমাণ করার। নিজের মতো করে।

১৪ জুনের দুপুরে লর্ডসের সবুজ গালিচা সাক্ষী রাখলো এক ইতিহাসের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার জয়—আর সেই জয়ের কান্ডারি টেম্বা বাভুমা। ব্যাটে হাতে তো আছেই, সঙ্গে নেতৃত্বের কৌশলে, মানসিক দৃঢ়তায়, আর অনুপ্রেরণায়।

বাভুমার চোখে ছিল তৃষ্ণা। একটা নয়, অনেক যুদ্ধের তৃষ্ণা। ট্রল, তিরস্কার, হতাশা—সব কিছুকে পেছনে ফেলে সেই চোখে ছিল শুধু সামনে তাকানোর সাহস। টেম্বা বাভুমার যাত্রাটা কখনোই সহজ ছিল না। কোটানীতির সুবিধাভোগী হিসেবে যাঁকে অবজ্ঞা করা হতো, সেই বাভুমা বারবার নিজেকে প্রমাণ করেছেন মাঠে। কখনো পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন, কখনো স্ট্রাইক রেট নিয়ে ট্রল, আবার কখনো ব্যর্থ হলে জাতিগত পরিচয় টেনে আক্রমণ—সবকিছু পেরিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছেন এক চরম উচ্চতায়।

তিনি নিজেই একবার বলেছিলেন, ‘অনেক সময় মনে হতো, আমি যেন নিজের দলেরই কেউ না।’ কিন্তু সেই বাভুমাই এখন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম অধিনায়ক, যিনি আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল জিতিয়েছেন দলকে। আর ঠিক সেখানেই বাভুমা জিতেছেন। পরিসংখ্যান বলে যা, হৃদয় জানে তারচেয়েও বেশিভ। ৬৩ টেস্ট, ৩৬০৬ রান, ৪টি শতক, ২৪টি অর্ধ-শতক—হ্যাঁ, এগুলো পরিসংখ্যান। কিন্তু বাভুমা মানে কেবল সংখ্যা নয়। তিনি এক প্রতিরোধের প্রতীক। এক নীরব যোদ্ধার জয়গান।

বর্ণবাদের মতো নির্মম বাস্তবতা আর ক্রিকেট-রাজনীতির কাঁটাঝোপ পেরিয়ে বাভুমা দাঁড়িয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল এক চূড়ায়। শুধু ব্যাট নয়, হাতে তুলে নিয়েছেন এক জাতির সম্মান। সেই সম্মান, যা ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথমবার আইসিসির কোনো ট্রফি হিসেবে এসেছে প্রোটিয়াদের ঘরে।

টেম্বা বাভুমা হয়তো আর দশটা তারকার মতো উজ্জ্বল নয়। কিন্তু তিনি ঠিক সেই দীপশিখা, যে ঝড়ের রাতে নেভে না। বরং আলো ছড়ায় পথহারা অনেকের জন্য। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট আজ তাঁর কাছে ঋণী, ঠিক যেভাবে ইতিহাস ঋণী হয় প্রতিটি দ্রোহীর কাছে।

টেম্বা বাভুমার নামের পাশে আজ আর কোটার অপবাদ নয়, আছে গর্বের এক অক্ষর ‘চ্যাম্পিয়ন’।