শাপমুক্তির দিনে প্রোটিয়ান ক্রিকেটাররা বললেন, ‘এ জয় পুরো দক্ষিণ আফ্রিকার’

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৫, ০৬:২২ পিএম

দীর্ঘ ২৭ বছরের অপেক্ষা। প্রতিটা বৈশ্বিক আসরে ছিটকে যাওয়ার বেদনা, সম্ভাবনার প্রান্তে গিয়ে থেমে যাওয়া—সব মিলে এক অভিশপ্ত তকমা বয়ে বেড়াতে হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকাকে। তাদের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘চোকার্স’! অবশেষে সেই তকমা ঘুচিয়ে নতুন ইতিহাস লিখল তারা। লর্ডসের সবুজ মঞ্চে তারা শুধু ট্রফি জিতেনি, মুক্তি পেয়েছে দীর্ঘদিনের শাপ থেকে।

এই মুক্তির নায়করা আজ কথা বললেন। আবেগে ভিজে ছিল কণ্ঠ, চোখে ছিল জল, আর হৃদয়ে ছিল গর্বের উত্তাপ। এই জয় শুধুই একটি ম্যাচ জেতা নয়—এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার উৎসব। শোনো, কী বললেন সেই শাপমুক্তির নায়কেরা।

দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথ এই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ধারাভাষ্যকারের ভূমিকায় ছিলেন। তার সঙ্গেই কথা বলেন ফাইনাল খেলা প্রোটিয়া ক্রিকেটার ও কোচের সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের কণ্ঠে ছিল এক সুর। তারা বলেছেন, ‘এই জয় পুরো দক্ষিণ আফ্রিকার।’

স্মিথের সঙ্গে কথা বলার সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি দক্ষিণ আফ্রিকার বাঁহাতি স্পিনার কেশভ মহারাজ। অশ্রুসিক্ত মহারাজ বলেন, ‘এই অনুভূতি বিশেষ, এই ট্রফি তোলা আমাদের জন্য সম্মানের। ঘরের মাঠে হোক বা দেশের বাইরে, এই কাপ প্রত্যেকের জন্য। গত পাঁচ দিনে আমাদের মধ্যে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, সেটাই দক্ষিণ আফ্রিকার পরিচয়। সবাইকে ধন্যবাদ। আমি যদি ব্যাট করতে নামতাম, আবেগই হয়তো আমাকে সঠিক পথে ঠেলে দিত। (দেশবাসীর উদ্দেশ্যে) যারা আমাদের পাশে থেকেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ। প্রতিকূলতা পেরিয়ে আমরা টিকে থেকেছি। আমরা তাদের সম্মান করি, যারা আমাদের আগেই এই পথ বেয়ে গেছেন। আশা করি এই জয় হবে আরও বড় কিছু শুরু হওয়ার পাথেয়।’

চতুর্থ ইনিংসে সেঞ্চুরি করে দলকে হয়তো শিরোপা জেতাতে এগিয়ে নিয়েছিলেন এইডেন মারকরাম। তবে জয়ের বীজ বপন করেছিলেন কাগিসো রাবাদা। যিনি প্রথম ইনিংসে ৫টি ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেট শিকার করেছিলেন। ম্যাচ জয়ের পর তিনি বলেন, ‘কী অনুভব করছি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। ভীষণ আনন্দিত। আমরা ভালো পরিকল্পনা করেছিলাম, কঠোর পরিশ্রম করেছি। এই জায়গায় আসাটা আমাদের প্রাপ্য। অনেকে বলেছে আমরা নাকি শক্ত দলের বিরুদ্ধে খেলিনি—এসব একদম বাজে কথা। এবার আমরা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছি, আমাদের সেরা খেলাটা খেলতে হয়েছে। সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা, শেষ চারটা দিন যেন ঘরের মাঠেই খেলছি মনে হয়েছে।’

দেশটির উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান রায়ান রিকেলটন বলেন, ‘চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিং করতে নামাটা সব সময়ই কঠিন হয়। উইকেটটা একটু ভালো দেখাচ্ছিল। তবে ছেলেরা দারুণ ব্যাট করেছে। এইডেনের ইনিংসটা আমি যত দেখেছি, তার মধ্যে অন্যতম সেরা। এত বড় মঞ্চে, এত অভিজ্ঞ বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে এমন ইনিংস বিশেষ কিছু। সকালে আমরা আলোচনা করছিলাম। আমি আউট হলেও বেশ শান্ত ছিলাম। দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ছিল। আমরা শুরুতে চাপটা সামলাতে চেয়েছিলাম, তারপর খেলা এগিয়ে নিতে। কিছুটা নার্ভাসনেস অবশ্য ছিল।’

২৭ বছর পর কোনো শিরোপা জেতাতে ক্রিকেটারদের যেমন অবদান থাকে, তেমনি অবদানের কোনো অংশে পিছিয়ে থাকেন না কোচরাও। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান কোচ শুকরি কনরাড তাই শিরোপা জয়ের পর বললেন, ‘আমার আবেগ কেশভের চেয়েও খারাপ (হাসি)। ছেলেদের জন্য দারুণ খুশি। এই জয় পুরো দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য। এটা দিতে পারা এক অসাধারণ অনুভূতি। আমরা ব্যাটিংয়ের সেরা কন্ডিশন পেয়েছিলাম। ২৮০ রানের লক্ষ্য সব সময়ই কঠিন। কিন্তু এইডেন ও টেম্বা—এই দুই অভিজ্ঞ সৈনিক মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেল আর আমাদের জয়ের পথে নিয়ে গেল। আমি-ই বলেছিলাম টেম্বাকে যেন ইনজুরির পর ব্যাট না করানো হয়। কিন্তু এই জুটিটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ওরা আমাদের চেয়ে ভালো বোঝে কী করা দরকার।’

দলটির মারকুটে ব্যাটার হিসেবে পরিচিত দীর্ঘকায় পেসবোলিং অলরাউন্ডার মার্কো ইয়ানসেন, ‘বলার মতো কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না। বসে বসেই শুধু প্রার্থনা করছিলাম। ভাগ্য ভালো, আমরা কাজটা শেষ করতে পেরেছি। ড্রেসিংরুমে সবাই বেশ চুপচাপ, অনেকটাই স্নায়ুচাপে ছিল। কিন্তু গ্যালারির প্রতিটি চিৎকার, প্রতিটি রান উদযাপন—সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ একটা অভিজ্ঞতা। মারকরাম ছিল অবিশ্বাস্য! আর টেম্বার সঙ্গে ওর সেই জুটি—এটা সত্যিই স্বপ্নের মতো।’

ডেভিড বেডিংহাম বলেছেন, ‘অসাধারণ। খুব নার্ভাস লাগছিল। কিন্তু এইডেন আর টেম্বা যেভাবে খেলছিল, তাতে আমরা অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করেছি। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, শেষ পর্যন্ত আমরা পার হয়ে এসেছি। সূর্যের আলো ও কন্ডিশন আমাদের পক্ষে ছিল। ২৭ বছর হয়ে গেল—এখনো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে আমরা এই রকম একটা ম্যাচ জিতেছি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার মতো ভাষা নেই।’

কাইল ভারেইনে বলেছেন, ‘আমি শুধু হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি। সকালে খেলা দেখছিলাম আর বারবার ভাবছিলাম, ব্যাটিং করতে যেন না যেতে হয়। মাঠে নামার পর আমার জীবনের সবচেয়ে নার্ভাস মুহূর্ত ছিল সেটা। এই জয় অনেক কিছু বোঝায়। পুরো মাঠ যখন একসঙ্গে গাইছিল, সেটা ছিল দারুণ এক আবেগঘন মুহূর্ত। এখনো মনে হচ্ছে চোখে পানি চলে আসছে। এটা অসাধারণ।’

২৭ বছরের দীর্ঘ যন্ত্রণার পর দক্ষিণ আফ্রিকা যেন নতুন করে জন্ম নিল। আজ থেকে তারা আর ‘চোকার্স’ নয়, আজ তারা এক গর্বিত নাম—বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত