ক্রিকেট দিগন্তে অবশেষে রঙধনু

লর্ডসের ব্যালকনিতে সবাই যখন উল্লাসে মত্ত, টেম্বা বাভুমা তখন মাথা নিচু করে আছেন। হয়তো একটা মিনিটেই ফ্ল্যাশব্যাকে দেখে নিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পৌঁছাতে কতটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ টেস্ট অধিনায়ক বাভুমাকে অনেক সময়ই শুনতে হয়েছে ‘কোটার খেলোয়াড়’ অপবাদ। সেই বাভুমাই ক্রিকেটের তীর্থভূমিতে, তুলে ধরলেন খেলাটির সবচেয়ে মর্যাদার স্মারক। লর্ডসে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে হারিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাই এখন টেস্টের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। রঙধনুর দেশটি এই প্রথম বৈশ্বিক কোনো আসরের শিরোপা জিতল।

খেলার চতুর্থ দিনে দক্ষিণ আফ্রিকার জয়ের জন্য দরকার ছিল ৬৯ রান, হাতে ৮ উইকেট। দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান টেম্বা বাভুমা ও এইডেন মার্করাম। যাদের ব্যাটে তৃতীয় দিনের খেলাতেই অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেছে অস্ট্রেলিয়ার হার। ২০১০ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালের পর এবারই প্রথম কোনো বৈশ্বিক আসরের ফাইনালে উঠেও হারল অস্ট্রেলিয়া। ৮ উইকেট হাতে ৬৯ রান করতে না পারার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে উঠতে পারত পুরাতন সেই চোকার্স তকমা। যদি দিনের শুরুতে দ্রুত কয়েকটা উইকেট তুলে নেওয়া যায়, যদি দক্ষিণ আফ্রিকাকে কোণঠাসা করা যায়...ধারাভাষ্যে দীনেশ কার্তিক এমনটাই বলছিলেন। হয়তো ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালের সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তার এমন আশঙ্কা। কিন্তু এক বছর আগের হেরে যাওয়া ফাইনালের অধিনায়ক মার্করাম লর্ডসে আগের ভুল আর করেননি। দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়তে যদিও পারেননি, তবে একদম জয়ের দোরগোড়ায় রেখেই বিদায় নিয়েছেন ট্রাভিস হেডের হাতে ক্যাচ দিয়ে। তার আগে খেলেছেন ২০৭ বলে ১৩৬ রানের এক অসামান্য ইনিংস, যে ইনিংসই ব্যবধান গড়ে দিয়েছে দুই দলের ভেতর।

প্রথম ইনিংসে দুই দলেরই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানরা ছিলেন ব্যর্থ। উসমান খাজা ০, মারনাস লাবুশেন ১৭; অন্যদিকে এইডেন মার্করাম ০ আর রায়ান রিকেলটন ১৬। দ্বিতীয় ইনিংসে লাবুশেন ২২, খাজা ৬ আর প্রোটিয়াদের হয়ে মার্করাম করলেন ২৮২ রান তাড়ায় ১৩৬, এখানেই তো স্পষ্ট ব্যবধানটা। বাভুমার ১৩৪ বলে ৬৬ রানের ইনিংসের মাহাত্ম্যও কম নয়। মার্করাম যদি এডমন্ড হিলারি হন তাহলে বাভুমা তেনজিং, দুজনে মিলেই তো প্রথমবারের মতো কোনো বিশ্ব আসরের শিরোপা জেতালেন দক্ষিণ আফ্রিকাকে।

প্রোটিয়াদের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ২০ জন ব্যাটসম্যানের যদি তালিকা করা হয়, সেখানে কাইল ভেরায়েনের নামটা নিঃসন্দেহে থাকবে না। অথচ দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা মুহূর্তটা এলো তারই ব্যাটে। জয়সূচক রানটা নেওয়ার দুই বল আগেও র‌্যাম্প শট খেলতে গিয়ে আউট ছিলেন ভেরায়েন, বল লাগে তার গ্লাভসে। কিন্তু আম্পায়ার শব্দ শোনেননি, অস্ট্রেলিয়ার হাতেও রিভিউ ছিল না। তাই ডিআরএসের সুবিধাও নিতে পারেননি প্যাট কামিন্স। সেই ভেরায়েনই মিচেল স্টার্কের করা ওয়াইড ফুলটসে ব্যাট চালিয়ে কভার অঞ্চলে বল ঠেলে দিয়েই দিলেন দৌড়, পূর্ণ করলেন বহুল কাক্সিক্ষত সেই রান যার মাধ্যমে ১৯৯৮ সালের পর কোনো আইসিসি আসরের শিরোপা নিশ্চিত করল দক্ষিণ আফ্রিকা।

জয়ের পর প্রোটিয়া অধিনায়ক বাভুমা জানালেন তার অনুভূতির কথা, ‘খুবই বিশেষ কয়েকটা দিন গেল, কখনো কখনো মনে হয়েছে আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাতেই আছি। আমরা ভালো প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেরাটা দিয়েই লড়েছি। এই ঘোরটা কাটতে কিছুটা সময় লাগবে। একটা দল হিসেবেই আমরা এমন কিছু একটা চাচ্ছিলাম, আমরা ছিলাম একনিষ্ঠ, বারবার সাফল্যের দোরগোড়া থেকে ফিরে আসার কারণে যে রক্তক্ষরণ আমাদের হৃদয়ে সেসব আমাদের শক্ত করেছে। আমাদের নিয়ে যারা সন্দেহ করত, এই জয় তাদের সেসব সন্দেহকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে। আমরা এখন এক হয়ে উদযাপন করব।’

অন্যদিকে প্যাট কামিন্স হারের পর জানালেন এই হার তাদের প্রাপ্য, ‘সবকিছু খুব দ্রুত বদলে যায় ঠিকই, তবে আমাদের জন্য এই ঘাটতিটা দূর করা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছিল। আমরা ভালো ব্যাট করিনি, প্রথম ইনিংসে ভালো ব্যাট করার পরও আমরা ভালো একটা লিড নিতে পারিনি। শীর্ষ ৭ ব্যাটসম্যানকে নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েই গেল, এরাই দুই বছর ধরে ভালো খেলে আসছিল। এইডেন আর টেম্বা আমাদের কোনো সুযোগই দেয়নি।’

ম্যাচসেরার পুরস্কার পেয়েছেন এইডেন মার্করাম। দুটো উইকেট আর ১৩৬ রান করা মার্করাম তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, ‘এরচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রান আমি আগে কখনো করিনি। আসলেই কীভাবে ভাগ্য বদলে যায়, প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়েছিলাম। একটু ভাগ্যের ছোঁয়া দরকার ছিল, উইকেটে কিছুটা সময় কাটালাম আর রান পেলাম। লর্ডস এমন একটা জায়গা যেখানে সবাই খেলতে চায়, এখানে ফাইনাল খেলাটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার।’

দেশের মাটিতে ভারতকে হারিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা শুরু করেছিল ২০২৩-২০২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চক্র, যার শেষটা হয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে। এই চক্রেই এসএ টোয়েন্টির সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা দলের নিউজিল্যান্ড সফরের সময়সূচি সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে নিউজিল্যান্ডে আনকোরা একটা দল পাঠিয়েছিল প্রোটিয়ারা। যেখানে দুটো ম্যাচই তারা হেরেছিল বড় ব্যবধানে। বছর দেড়েকের মাথায় সেই দক্ষিণ আফ্রিকাই জিতল বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ, সেটাও অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে।