বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোচ হলেই বোধহয় তাকে বিশ্বের সবচেয়ে আশাবাদী মানুষটি হয়ে যেতে হয়। হয়তো বিজ্ঞাপনে যোগ্যতা হিসেবে লেখাও থাকে, ‘আশাবাদী হইতে হইবে’। ফিল সিমন্সের কণ্ঠে মেহেদী হাসান মিরাজের অনুপস্থিতির কারণে আরেকজনের একাদশে জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনার কথা শুনে তাই মনে হবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সদ্যসমাপ্ত চক্রে বাংলাদেশের সেরা পারফরমারের নাম মিরাজ এবং সেটা অন্যদের যোজন যোজন পেছনে ফেলে। আচমকাই দলে ঢুকে তার চেয়ে প্রত্যাশাতীত ভালো করে ফেলবেন, এমন কাউকে নির্বাচকরা বাংলাদেশে রেখেও যাননি আর স্কোয়াডেও নেই।
টেম্বা বাভুমার হাতে শোভা পাচ্ছে আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের জয়ীর রাজদন্ড। এই রাজদন্ড পাওয়ার লড়াইতে লড়েছিল বাংলাদেশও। ২০২৩-২৫; এই চক্রে বাংলাদেশ খেলেছে ১২ টেস্ট, সবগুলোই খেলেছেন মিরাজ। ১২ টেস্টের ২২ ইনিংসে মিরাজের রান ৭০৭। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ভেতর সবচেয়ে বেশি রান তারই। মনে করিয়ে দেওয়া ভালো, মিরাজ ব্যাটিং করেন ৭ নম্বরে। এই চক্রে সবচেয়ে নিয়মিত সুযোগ পাওয়া উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান জাকির হাসান ১০ টেস্টের ২০ ইনিংসে করেছেন ৩৩৫ রান, মিরাজের অর্ধেকেরও কম। এই একটা পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে মিরাজ কতবার মান বাঁচিয়েছেন দলের। অফস্পিনে মিরাজ ১২ ম্যাচে নিয়েছেন ৩৯ উইকেট। তার চেয়ে কেবল ১ উইকেট বেশি নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি তাইজুল ইসলাম। ফিল্ডার হিসেবে মিরাজ ক্যাচ নিয়েছেন ১৬টি, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নাজমুল হোসেন শান্তর ক্যাচ সংখ্যা ১২। এই পরিসংখ্যান যে ক্রিকেটারের, তাকে দলে পাওয়া নিয়ে যখন আশঙ্কা তৈরি হয় এবং কোচ ব্যাপারটিকে ‘মধুর সমস্যা’ মনে করেন, তখন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে আশাবাদী মানুষের খেতাব দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ই থাকে না। গলে, শ্রীলঙ্কায় পা রাখার পর প্রথম দিনের অনুশীলনের এক ফাঁকে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের কাছে সিমন্স বলেছেন, ‘এটা (মিরাজের অসুস্থতা) নিশ্চয়ই চিন্তার। তবে একজনের সমস্যা অন্যজনের জন্য সুযোগ এনে দেয়। দলের সবাই চায় মিরাজ সুস্থ হয়ে উঠুক, কিন্তু তারা এও জানে, যদি মিরাজ নাও খেলতে পারেন, তাহলে অন্য কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে। এটা সমস্যা, তবে সমস্যাটা মধুর।’
সদ্যই এক বছরের জন্য ওয়ানডে অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়া মিরাজ টেস্ট দলেরও সহ-অধিনায়ক। নেতৃত্বের গরমেই গা গরম হয়ে গেল কি-না তা বলা মুশকিল তবে গল টেস্টে মিরাজকে পাওয়ার ব্যাপারে কোচ সিমন্স এখনো দ্বিধাগ্রস্ত, ‘গত দুই দিনে সে অনেকটাই ভালো আছে। আমরা দেখব সন্ধ্যায় ওষুধের পর সে কেমন থাকে। আশা করি, কাল অনুশীলন করতে পারবে এবং খেলার জন্য প্রস্তুত থাকবে।’ মিরাজ যদি শেষ পর্যন্ত খেলতে না পারেন, তাহলে হয়তো একাদশে আসবেন নাঈম হাসান। ১৬ সদস্যের দলে মিরাজের বাইরে অফস্পিনার এই একজনই। গলের এই মাঠ স্পিনারদের জন্য রীতিমতো স্বর্গ, অফস্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরন এখানে ১৫ টেস্টে নিয়েছেন ১১১ উইকেট। এ রকম একটা ভেন্যুতে মিরাজকে না পাওয়াটা কেন কোচের কাছে মধুর সমস্যা মনে হচ্ছে, সেটা সাধারণ জ্ঞানে ব্যাখ্যা করা না গেলেও এটা স্পষ্ট যে ব্যাটিং এবং বোলিং উভয় ভূমিকায় মিরাজের বিকল্প কেউ স্কোয়াডে নেই। নাঈম সবশেষ দুটো প্রথম শ্রেণির ম্যাচে নিউজিল্যান্ড ‘এ’ দলের বিপক্ষে দুটো ইনিংসে ৪ উইকেট করে পেয়েছেন, তবে ব্যাটিংয়ে মিরাজের মতো ভরসার হাত তিনি নন।
গলের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম সুখস্মৃতি জড়িয়ে। এখানেই মুশফিকুর রহিম প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন, সেবারই প্রথম বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের ব্যাটে দেখা গিয়েছিল ২০০ ছাড়ানো ইনিংস। তার কাছ থেকে অবশ্য বাড়তি কোনো প্রত্যাশা নেই সিমন্সের, ‘আমি চাই সে যেন খেলাটা উপভোগ করে। ওই ইনিংস যেমন সে আনন্দ নিয়ে খেলেছিল, এবারও যেন সেটাই করে, তা-ই চাই। মুশফিকের কাছে আলাদা কোনো প্রত্যাশা নেই সব খেলোয়াড়ের কাছেই আমার চাওয়া একই থাকবে।’ ৯৬ টেস্ট খেলে ফেলা মুশফিকের কাছে কোচের বাড়তি প্রত্যাশা না থাকলেও বাংলাদেশ দলের নিশ্চয়ই আছে। রাওয়ালপিন্ডিতে ১৯১ রানের ইনিংসের পর ১৩ ইনিংস পার হয়ে গেছে, এর ভেতর একবারও পঞ্চাশ পার করতে পারেননি বাংলাদেশের ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’।
কেউ কেউ বলেন, শ্রীলঙ্কা হচ্ছে রাবণের দেশ। বাংলা প্রবাদ আছে, ‘যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’। বাংলাদেশ দলের সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের বেলাতেও ব্যাপারটা যেন সত্যি হয়ে দেখা দিয়েছে। একসময় বাংলাদেশ দলে ৪ জন উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান নেওয়ার সমালোচনা করেছিলেন সালাহউদ্দিন, তার দলেই এখন ৫ জন উইকেটরক্ষক। আর একজন অলরাউন্ডার অসুস্থ হলে তার পরিবর্তে নামানোর মতো কেউ নেই। মনে হচ্ছে তার জন্যই ‘অতি দর্পে হত লঙ্কা’ প্রবাদটিও প্রযোজ্য হবে।