দুর্গ শহর গলের উইকেটে বোলাররা যেন পরাজিত সৈনিক। এখানে সাফল্যের জন্য প্রয়োজন অসীম ধৈর্য। ব্যাটসম্যানদের জন্যও সাগর পাড়ের ২২ গজে আছে রানের ভা-ার, তবে সেই ভা-ারে প্রবেশের কৌশলটা জানতে হবে। মুশফিকুর রহিম জানেন, কী করে রান করতে হয় গলে। এখানে খেলা ৪ ইনিংসে তার আছে ডাবল সেঞ্চুরি, সেঞ্চুরি এবং হাফসেঞ্চুরি। প্রথম দিনের খেলা শেষে সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই সংবাদ সম্মেলনে আসা মুশফিক বললেন, প্রথম ইনিংসে বড় সংগ্রহের প্রচেষ্টা থাকবে বাংলাদেশের যাতে করে ৮০-১০০ রানের একটা লিড পাওয়া যায়।
গলের উইকেটে রান হয়। এই গলেই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ টেস্ট ইনিংস, ৬৩৮ রানের সেই দলীয় ইনিংসে ডাবল সেঞ্চুরি ছিল মুশফিকের, ১৯০ রান করেছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল আর নাসির হোসেনেরও ছিল সেঞ্চুরি। একই ম্যাচে শ্রীলঙ্কাও ৪ উইকেটে ৫৭০ রান তুলে প্রথম ইনিংসে দান ছেড়েছিল। এই মাঠে হয়ে যাওয়া সবশেষ দুই টেস্টে অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে করেছে ৬৫৪/৬ (ডিক্লে.) ও ৪১৪। তার আগের টেস্টে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শ্রীলঙ্কা করেছিল ৬০২/৫ (ডিক্লে.)। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, প্রথম দিন শেষে ৩ উইকেটে ২৯২ রান করা বাংলাদেশকে জয়ের সম্ভাবনা জাগানোর জন্য পাড়ি দিতে হবে লম্বা পথ। ব্যাপারটা জানেন মুশফিকও, ‘প্রথম দিনটা নিঃসন্দেহে আমাদের। কাল (আজ) তিনটা সেশনের দুইটা অন্তত যেন আমরা জিততে পারি। আমাদের জন্য নতুন একটা দিন, ওদের হাতে নতুন বল আছে, মাত্র ১০ ওভার খেলা হয়েছে। প্রথম ১ ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের লক্ষ্য থাকবে যত বেশি সময় সম্ভব ব্যাট করা। প্রথম ইনিংসেই যদি আমরা বড় একটা লিড নিতে পারি, ভালো একটা সংগ্রহ দাঁড় করাতে পারি, যাতে ওদের চেয়ে আমরা ৮০ বা ১০০ রান এগিয়ে থাকতে পারব সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে প্রথম ইনিংসের পরই উইকেট খারাপ হতে শুরু করে।’
গলে ২০১৩ সালের সেই ডাবল সেঞ্চুরির সঙ্গে এই ইনিংসের তুলনা না করলেও মুশফিক বুঝিয়েছেন, প্রায় ৬০০ রানের বোঝা কাঁধে নিয়ে ব্যাট করাটা ছিল তুলনামূলক কঠিন, ‘গল দেখেন ২০০ তো...আসলে কোনো ম্যাচেই তো কোনো ব্যাটসম্যান আসলে চিন্তা করে না যে এই ম্যাচে আমি ১০০ করব বা ২০০ করব, প্রথমেই থাকবে যখন সুযোগ আসবে উইকেটে গিয়ে বড় জুটি গড়ে দলের জন্য অবদান রাখা। সেটা হতে পারে প্রথমে ২০ রান, এরপর ৫০ রান, এরপর ১০০... ২০০ এইভাবে। সেদিক থেকে বলব সুযোগ যেহেতু আছে তবে কাল (আজ) নতুন একটা দিন, আমাদের আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। গল স্পেশাল...এটা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার হিসেবে এখানে যখন আপনি প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করবেন, এটা অবশ্যই স্পেশাল। আমাদের একটা প্রজন্মকে তো ধাপে ধাপে ওপরে নিয়ে যেতে হবে আর আমি মনে করি তারা ওটার পর বিশ্বাস করতে পেরেছে যে টেস্টে ২০০ করা যায়।’ ১৮৬ বলে ১০৫ রানের ইনিংসে বাউন্ডারি মাত্র ৫টি অর্থাৎ ৮৫ রানই নিয়েছেন দৌড়ে। নিজের ইনিংস নিয়ে মুশফিক বললেন, ‘এরা ফিল্ড প্লেসমেন্টটা ওভাবেই করে। কন্ডিশন বেসিস করে। আপনি অন্যান্য প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দেখবেন যে দুই তিনটা চার মারার পর ঐ ফিল্ডারটা পেছায়, ওরা একটা চার মারার পরই ফিল্ডার পিছিয়ে নেয়, ইন অ্যান্ড আউট ফিল্ডিং সেট করতে থাকে। ওরা যখন এই ধৈর্যটা দেখাবে আমরা ব্যাটসম্যানরাও যেন ঐ ধৈর্যটা রাখি, এটাই দলীয় বৈঠকে বারবার বলা হয়েছে। টেস্ট ক্রিকেট যতই চার-ছয়ের খেলা হোক না কেন, সিঙ্গেলস খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রান্ত বদল করতে থাকলে বোলারের জন্য সমস্যা হয়, ডান-বামহাতি কম্বিনেশন থাকলে ফিল্ডিংয়ে পরিবর্তন আনতে হয়, তাই সিঙ্গেলস খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যই অনুশীলন করা লাগে যেন আমরা ফিট থাকি।’
মুশফিকের আশা, ১৩৬ রানের ইনিংসটাকে আরও বড় করবেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। তার ইনিংসটা কাছ থেকে দেখা মুশফিকের কাছে ভালো লেগেছে নিজের ব্যাটিংয়ের ওপর শান্তর নিয়ন্ত্রণ, ‘শান্ত অনেকদিন ধরে ভালো খেলছে। টেস্টে ওর রেকর্ড ভালো, ক্যাপ্টেন্সির রেকর্ড ভালো। আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ইনিংসটায় ওর নিয়ন্ত্রণ, খুবই কন্ট্রোলড ইনিংস খেলেছে। এর আগেও ও শ্রীলঙ্কাতে, ক্যান্ডিতে ১০০ করেছে তবে এই ১০০টা খুব ভালো ইনিংস, বিশেষ করে যেভাবে কন্ট্রোল করে ইনিংসটা খেলেছে, চান্সলেস খেলা, আমার কাছে মনে হয় এরপর যারা ব্যাট করবে তাদের কাছে খুবই শিক্ষণীয়।’
আজ সকালে শান্তর সঙ্গেই ফের ২২ গজে পা রাখবেন মুশফিক, প্রচেষ্টা থাকবে দুজনের ২৪৭ রানের জুটিটাকে আরও যতটা সম্ভব বড় করা যায়।