শেষযাত্রা ও শিল্পভাবনা: মৃত্যু, কবিতা, দর্শন

মূল: ম্যানফ্রেড মালজান    অনুবাদ: মাসুদুল হক

বছরের পর বছর ধরে আমি বুঝতে শিখেছি, যেসব কবিতা সবচেয়ে বেশি পাঠ করা হয়, সেগুলোকেই সবচেয়ে বেশি ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। এমনকি বিচক্ষণ পাঠকরাও অনেক সময় কবিতার প্রতীক ও পটভূমিকে

যথাযথভাবে ধরতে পারেন না। উদাহরণস্বরূপ, অ্যাডমন্ড স্পেন্সারের Amoretti-এর সনেট ৭৫ প্রায়শই এভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে বক্তা সৈকতে দাঁড়িয়ে প্রেমিকার নাম বালিতে লেখে, যদিও ‘One day ’ শব্দবন্ধটি স্পষ্টভাবে সময়গত ও স্থানগত দূরত্বকে নির্দেশ করে। আবার অ্যান্ড্রু মার্ভেলের ‘To His Coy Mistress’ কবিতায় মৃত্যুর ভয়, কবরের নীরবতা এবং পোকামাকড়ের বিবরণ প্রেম নিবেদনের উপযোগী মনে করা হয় যদিও বাস্তবিক অর্থে এসব উপমা প্রেমের আবেদনকে আরও বেশি ভীতিকর করে তোলে।

ডিলান থমাসের ‘ÔDo not go gentle into that good night’ কবিতাটি নিয়েও এই ধরনের ভুল ব্যাখ্যা বহুল প্রচলিত। প্রায় সবাই ধরে নেয়, কবিতাটি এক পুত্র তার মৃত্যুশয্যায় শায়িত পিতাকে উদ্দেশ করে বলছে। যদি সত্যিই এটি কোনো পুত্রের বক্তব্য হয়, তাহলে তার পিতা যেন তখনো এতটা সক্ষম থাকতেন যে, বক্তাকে চুপ করিয়ে দিতে পারতেন। একজন মানুষের মৃত্যুর মুহূর্তে তাকে শেখানো কীভাবে মরতে হবে তা নিঃসন্দেহে অনধিকারচর্চা। বরং, এই কবিতার বার্তাটি অনেক বেশি গভীর ও অন্তর্মুখী : প্রিয়জনের মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার অক্ষমতা থেকে জন্ম নেওয়া এক ধরনের ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া। ‘রাগ করো আলোর মৃত্যুর বিরুদ্ধে’ পঙ্ক্তিটি যেন জীবনের প্রতি এক আকুল, শেষ চেষ্টা একটি আত্মিক, মানসিক জেদ।

এই কবিতা পাঠকের সঙ্গে এমন এক দর্শনগত দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, যার শেকড় স্টোয়িক চিন্তাধারায়। স্টোয়িক দর্শনে, মৃত্যু শান্তভাবে মেনে নেওয়ার মতোই গ্রহণযোগ্য এক বাস্তবতা এবং এটিকে আবেগহীনভাবে কবুল করাটাই আদর্শ হিসেবে বিবেচিত। জন ডানের ‘A Valediction : Forbidding Mourning’ কবিতার শুরুতেই যে virtuous men pass mildly away’ কথাটি আছে, তা ভিক্টোরিয়ান মূল্যবোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এই দর্শনের প্রভাব দেখা যায় জন রন্সির লেখা ‘Worn Hands’ নামের কবিতাতেও, যেখানে বলা হয়েছে : ‘

ÔOld men go gently to their separate rest; The warrior’s heart subdues; the poet’s song

With twilight sweetness sings of strife repressed,

And peace at last grown strong...

এই পঙ্ক্তিগুলোর মাধ্যমে এমন এক মৃত্যু-বোঝাপড়ার চিত্র আঁকা হয়েছে, যেখানে আবেগ নেই, আছে একটি শান্ত অবসান। কিন্তু ডিলান থমাস এই ধারণার বিপরীতে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং তাকে চ্যালেঞ্জ করাই মানুষের কাজ। এমন একটি সময়েও, যখন পরকাল বিশ্বাসের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, তার কবিতায় উঠে আসে জীবনের প্রতি প্রবল আকর্ষণ এবং অবসানের বিরুদ্ধে এক অন্তর্দহন।

ফিলিপ লারকিনের ‘Aubade’ কবিতায়ও মৃত্যু নিয়ে গভীর দার্শনিক অনুধ্যান দেখা যায়, যদিও তিনি শেষমেশ জানান মৃত্যুকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, কারণ ‘Death is no different whined at than withstood|।’ অন্যদিকে, ক্লাইভ জেমসের ‘Event Horizon’ কবিতায় একটি অন্তিম পরিতৃপ্তির ভাবনা রয়েছে: The only blessing of the void to come/Is that you can relax.’

স্টোয়িক দার্শনিকরা বিশ্বাস করতেন, মৃত্যু সম্পর্কে সচেতনতা জীবনের গুণগত মান বাড়াতে পারে। এটি যদি ভয় নয় বরং উপলব্ধি হয়, তবে তা মানুষের আত্মশুদ্ধিতে সহায়ক। গাইয়াস মুসোনিয়াস রুফুস বলেছিলেন, ‘Choose to die well while you can’ এই কথা শুধু মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের মূল্য অনুধাবনের ডাক। 

আধুনিক সমাজে, যেখানে সহায়তামূলক মৃত্যুর অধিকার নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে, সেখানে গ্রিক-রোমান মূল্যবোধ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়: মৃত্যু শুধু শারীরিক পরিণতি নয়, এটি সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও ব্যক্তিক সিদ্ধান্তেরও অংশ।

এই আলোচনায় ইয়ান ক্রাইটন স্মিথের ‘Old Woman’ কবিতাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বার্ধক্যের করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে এক বৃদ্ধা অন্ধভাবে চামচ খোঁজ করছেন এবং তার স্বামী ঈশ্বরের কাছে তার মৃত্যু কামনা করছেন। কবি নিজে এই দৃশ্য দেখে লজ্জিত ও অসহায় বোধ করেন। তিনি লেখেন:

Outside, the grass was raging. There I sat

imprisoned in my pity and my shame

that men and women having suffered time

should sit in such a place, in such a state

and wished to be away, yes, to be far away

with athletes, heroes, Greeks or Roman men

who pushed their bitter spears into a vein

and would not spend an hour with such decay.

এই কবিতা যেন চূড়ান্ত অবক্ষয়ের বাস্তব রূপ। ডিলান

থমাসের প্রতিবাদী কণ্ঠের সঙ্গে এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উভয়েই মৃত্যু ও বার্ধক্যকে কেন্দ্র করে এক গভীর মানবিক প্রশ্ন তোলে আমরা কীভাবে মরব এবং কীভাবে মরতে দেব? এই আলোচনার পরিপূরক হিসেবে সিমোন দ্য বোভোয়ার-এর বই La Vieillesse (Old Age) পড়া উচিত। বইটি মৃত্যু ও বার্ধক্যকে শুধুমাত্র শারীরিক নয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে বিশ্লেষণ করে এবং আমাদের শেখায় বার্ধক্য ও মৃত্যু কেবল একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং সমাজ কীভাবে এই প্রক্রিয়াকে বোঝে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বোপরি, কবিতা ও দর্শনের সংলাপে মৃত্যু কখনোই কেবল নিস্তব্ধতা নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর ও ব্যক্তিগত প্রশ্নগুলোর একটি। আর এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, আমাদের জীবনের মানে খোঁজারই আরেক নাম। 

ম্যানফ্রেড মালজান (Manfred Malzahn) একজন জার্মান সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ ও ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক