‘আগ্নেয়াস্ত্রের রাজনীতি’ এবং ‘পরমাণু অস্ত্রগন্ধ’

মধ্যপ্রাচ্য এখন বিস্ফোরণের চূড়ান্ত বৃত্তে ঘূর্ণায়মান। যার কেন্দ্রবিন্দুতে ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। গত কয়েক দিনে ঘটনাবলি যেভাবে এগিয়েছে, তাতে বিশ্ববাসীর মনে একটাই প্রশ্ন আমরা কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে? ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উগ্রতা, ইরানের ভূরাজনৈতিক প্রভাব, ফিলিস্তিনের গণহত্যা, হিজবুল্লাহ ও হামাসের পাল্টা প্রতিরোধ, আর এই সবকিছুর মধ্যে  ট্রাম্পের হুমকি সদৃশ বক্তব্য সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বলেন, ‘১০ মিলিয়ন ইরানিকে অবিলম্বে তেহরান ত্যাগ করতে হবে’, তখন সেটি নিছক রাজনৈতিক স্টান্ট নয়, বরং ধ্বংসযজ্ঞের স্পষ্ট আগাম বার্তা। উগ্র জাতীয়তাবাদের মোড়কে মোড়া ইসরায়েলি সরকার গাজা, পশ্চিম তীর, লেবাননের সীমান্ত পেরিয়ে এবার সরাসরি ইরান পর্যন্ত আগ্রাসনের হাত বাড়িয়েছে। একদিকে গাজায় গণহত্যা চালিয়ে ‘হামাস নির্মূল’ অভিযান, অন্যদিকে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ট্যাংক গড়ানো, আর এখন সেই একই যুক্তিতে ইরানের বিরুদ্ধে বিমান ও ড্রোন হামলা চালানো সব মিলিয়ে ‘যুদ্ধ’ যেন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।

এই মুহূর্তে ইসরায়েলের ভেতরে যে রাজনৈতিক সংকট ও নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তার ধস চলছে, সেই পটভূমিতে বিভিন্ন সামরিক অভিযানকে কাকতালীয় বললে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এক বাক্যে অস্বীকার করবেন। বরং এই প্রশ্ন জোরালোভাবে উঠছে যুদ্ধ কি নেতানিয়াহুর বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে? নেতানিয়াহুর আগ্রাসন আসলে কেবল সীমান্তের ওপারে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক ধরনের রাজনীতির কৌশল, যার মাধ্যমে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ সমালোচনা থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে চান। দুর্নীতির মামলায় জর্জরিত, বিচারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে চাওয়া, সংসদের ভেতরে-বাইরে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এসব কিছুর মাঝখানে যুদ্ধই যেন হয়ে উঠেছে তার ‘অস্ত্র’। ধর্ম, অস্ত্র আর উগ্র জাতীয়তাবাদের মিশ্রণ ইসরায়েলকে যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্ব রাজনীতির জন্য এক ভয়ানক সংকেত। ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়ানো মানে গোটা অঞ্চলে একটি বহুমাত্রিক যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করা। এই আগুনে একবার পুড়ে গেলে শুধু গাজা নয়, তেলআবিব-হায়ফাও হয়তো আর নিরাপদ থাকবে না।

ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, এটি একটি আদর্শ ও প্রতিরোধের প্রতীক। পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান কেবল আত্মরক্ষার প্রশ্ন নয়, বরং একটি ‘ভূরাজনৈতিক প্রতিরোধ বলয়’-এর নেতৃত্ব। সিরিয়া, হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের মাধ্যমে ইরান নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের শাসক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তেল, গ্যাস, ধর্ম এবং ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সব মিলিয়ে ইরান এই অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এবং সেই অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে চায় তারা। যে শক্তি বর্তমানে ইসরাইলের হামলার পাল্টা জবাব দিয়ে দেখাতে চাইছে। তেহরান খালি করার উক্তি ট্রাম্পের সন্ত্রাস নাকি কূটনীতি? এই প্রশ্ন এখন বিশ্ববাসীর। এমন উসকানি আগুনে ঘি ঢালার মতো। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্য বহুবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নাটকীয়তা, উসকানিমূলক ভাষা আর একচেটিয়া দম্ভ এই শব্দগুলোতে তার বক্তব্যের সারমর্ম তুলে ধরা যায়। যখন তিনি বলেন, ‘তেহরান এখনই খালি করতে হবে,’ তখন তা নিছক বাক্যবাণ নয় বরং তা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ভয়ংকর রূপ উন্মোচন করে। এমন একপেশে হুমকি কূটনৈতিক নয়, বরং পরমাণু সন্ত্রাসের ইঙ্গিত দেয়। এই বক্তব্য ইরানকে শুধু সরাসরি হুমকি দেওয়ার নামান্তর নয়, এটি মার্কিন আগ্রাসনের ভয়ংকর সংকেত।  ট্রাম্পের এ ধরনের উক্তি ঠিক সেই পুরনো যুদ্ধ-আক্রোশের পুনরাবৃত্তি, যার বাস্তব পরিণতি ভয়ানক হতে পারে। তার ‘তেহরান খালি’ মন্তব্য শুধু ইরান নয়, গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। কূটনীতি বা শান্তিপূর্ণ সমাধানের কোনো পথ না দেখিয়ে তিনি যেভাবে সরাসরি আগ্রাসনের হুমকি দেন, তা একদিকে বিশ্ব জুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ায়। ইতিমধ্যেই তার মন্তব্যের পর তেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি বেড়েছে। ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন, ফিলিস্তিন যেখানেই হোক না কেন, আমেরিকার ভূমিকা প্রায়ই পরিস্থিতিকে শান্ত করার বদলে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। ইসরায়েল-ইরান দ্বন্দ্ব বহু বছর ধরে ছায়াযুদ্ধ বা প্রোক্সি ওয়ারের পর্যায়ে ছিল। ড্রোন হামলা, সাইবার আক্রমণ, গুপ্তঘাতকতা এসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ২০২৪-২৫ সালে পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইসরায়েল যখন সিরিয়ায় ইরানি ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়, তখন ইরান সরাসরি ইসরায়েল অভিমুখে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে। এই পাল্টা হামলা যুদ্ধের নিয়মনীতিকে ছাপিয়ে যায়। এটাই ছায়াযুদ্ধের অবসান এবং সরাসরি সংঘাতের শুরু। এই অবস্থায় একটিমাত্র ভুল হিসাব পুরো অঞ্চলকে ধ্বংস করতে পারে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, বাস্তবতা কতটুকু? নাকি প্রচারণা! ইরান বলছে, তারা পরমাণু অস্ত্র বানাবে না, কিন্তু সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে পশ্চিমা দেশগুলোর শঙ্কা ক্রমাগত বাড়ছে। ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের সীমিত প্রবেশাধিকার এবং বারবার চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ ইরানকে বিশ্বমঞ্চে একঘরে করে ফেলছে। অন্যদিকে এই কর্মসূচির অনেক কিছুই ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হচ্ছে যাতে বিশ্ব মত গঠনে সুবিধা হয়। এই দ্বৈত বাস্তবতা থেকেই উত্তেজনার সূচনা। এ যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অনেক। ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান সহযোগীরা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির ধারক নয়, বরং একটি ‘নিয়ন্ত্রিত সংঘর্ষ’-এর মধ্য দিয়ে সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সুরক্ষা দিতে চায়। এই কৌশল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং একে এক রকম ‘আগ্নেয়াস্ত্রের রাজনীতি’ বলা যায়। বিশ্বে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি ও সামরিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে তারা সংঘাতকে কাজে লাগাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নয়, বরং অস্ত্রের বাজার ধরে রাখাই এ কৌশলের মূল লক্ষ্য।

রাশিয়া-চীন ও নতুন বলয়ের অভ্যুদয় দেখছি আমরা। বিভিন্ন জোটের সম্প্রসারণ এবং রাশিয়া-চীনের কৌশলগত জোট পশ্চিমা দুনিয়ার একচেটিয়া আধিপত্যের ওপর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। ইরানকে ব্রিকসে অন্তর্ভুক্ত করা এবং রাশিয়ার অস্ত্র সহযোগিতা এই জোটকে শক্তিশালী করছে। এক্ষেত্রে যদি রাশিয়া-চীন একযোগে ইরানের পাশে দাঁড়ায় (শোনা যাচ্ছে, দাঁড়িয়েছে), তাহলে এই সংঘাত একটি বহুপাক্ষিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে এটি গাঁটছড়া বাঁধলে বিশ্বের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তাতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা নিয়ে সরব ছিল, কিন্তু গাজা বা ইরান ইস্যুতে তাদের ভূমিকা অনেকটাই নীরব। এই দ্বৈত আচরণ মুসলিম বিশ্বের কাছে ইউরোপের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণœ করেছে। ইউরোপের ‘নৈতিকতা’ এখন রাজনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘ এখন প্রায় ‘বিবৃতি প্রকাশের সংগঠন’ হয়ে গেছে। অনেকটা দন্তবিহীন বাঘ। নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যেকোনো প্রস্তাব আটকে দিতে পারে। গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব বারবার আটকে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কারণে। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে পরমাণু অস্ত্রের হুমকি ও প্রতিক্রিয়া বিশ্ব জুড়ে। ইসরায়েলের কাছে ইতিমধ্যেই শতাধিক পরমাণু বোমা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে ইরান যদি পরমাণু বোমা তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরব, তুরস্কসহ আরও কিছু দেশ নিজেদের পারমাণবিক শক্তি তৈরির পথে হাঁটবে। এ প্রতিযোগিতা বিশ্বকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে। বাস্তবতা হচ্ছে, ইহুদি-মুসলিম দ্বন্দ্বের খোলসে এখন ইসরায়েল-ইরান লড়াই ঢুকে গেছে। এতে ধর্মীয় উগ্রতা বিশ্বব্যাপী বেড়েছে। মসজিদ-সিনাগগে হামলা, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তৃতা এবং মুসলিমদের ওপর হেট ক্রাইমের সংখ্যা বেড়েছে। এটি যুদ্ধকে শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং সভ্যতাগত সংঘাতে পরিণত করছে। যুদ্ধ যতই ঘনীভূত হোক না কেন, বিশ্ব বিবেকের জাগরণ ছাড়া কোনো সমাধান আসবে না। মানুষ মরছে, ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়ছে এই সংকট সবার। এ সময়ে শান্তির কূটনীতি, মানবিক সহমর্মিতা এবং বিশ্বব্যাপী নাগরিক সচেতনতা একত্রে না হলে, আমরা নতুন এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করব। বলতেই হয়, ইসরায়েল-ইরান সংকট এখন আর কেবল দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা নয়, এটি এক বৈশ্বিক নিরাপত্তা হুমকি। এ অবস্থায় সামরিক সমাধান নয়, চাই কূটনৈতিক সংলাপ, মানবিক দৃষ্টি ও ন্যায়বিচারভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। না হলে এই আগুন শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা মানবজাতিকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।

লেখক: সাংবাদিক ও সমাজ গবেষক

columnistforum2023@gmail.com