কুমিল্লায় অরক্ষিত অবস্থায় বিনষ্ট হচ্ছে প্রত্নসম্পদ

কুমিল্লার পাঁচথুবী ইউনিয়নের ইটাল্লা গ্রামের প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ‘মন্তের মুড়া’। চার বছর আগে এখানে খননকাজ শুরু করেছিল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। শুরুতে কয়েক মাস কাজ চললেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন পড়ে আছে অরক্ষিত অবস্থায়। গবাদিপশুর বিচরণ, বৃষ্টি আর অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন প্রত্নসম্পদ। ২০২১ সালের মাঝামাঝি খননের সময় বেরিয়ে আসে অলংকৃত পোড়ামাটির ইট, ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তি, তেলের প্রদীপ, ছোট পাত্র, নলাকার পাত্র, পিরিচসহ বহু মূল্যবান প্রত্নবস্তু। প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া খনন শুরুর ফলে এসব নিদর্শন এখন হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, মন্তের মুড়ার খননে দুই দফায় ব্যয় হয়েছে ৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে দুই লাখ ৩৮ হাজার এবং পরের বছরে আরও ৬ লাখ টাকা ব্যয় হলেও বর্তমানে প্রত্নক্ষেত্রটি পড়ে আছে অরক্ষিত অবস্থায়।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মন্তের মুড়ায় ঢুকতেই চোখে পড়ে চার পিলারের একটি হলরুম। এরপর মূল মন্দিরের প্রবেশপথ। সেখানে রয়েছে তিনটি ভিন্ন সময়কালের মন্দির। রথশৈলীর আদলে নির্মিত মন্দিরগুলোর সীমানা প্রাচীর ও দেয়ালে রয়েছে জ্যামিতিক নকশার অলংকরণ। খননের সময় পাওয়া গেছে ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তি, নরম পাথরের দুর্গামূর্তি, অলংকৃত পোড়ামাটির ইট ও নানা ধরনের প্রাচীন ব্যবহার্য সামগ্রী। তবে খননের কয়েক মাস পরেই কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন অনেকেই জায়গাটিকে দেখেন একটি ধ্বংসস্তূপ হিসেবে। গরু-ছাগলের চলাচল, বৃষ্টির পানি আর আগাছায় ভরে গেছে প্রত্নক্ষেত্রটি।

মন্তের মুড়ার কাজ অসমাপ্ত রেখেই সদর দক্ষিণ উপজেলার ধর্মপুরের বালাগাজীর মুড়ায় শুরু হয়েছে নতুন খনন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সঠিক পরিকল্পনামাফিক না কাজ করলে এটি নিয়েও ঘটতে পারে একই ঘটনা।

ময়নামতি জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান মো. শাহীন আলম বলেন, দুই দফা খননের পরও এখন পর্যন্ত মন্তের মুড়ার পূর্ণাঙ্গ রূপ উন্মোচিত হয়নি। সেখানে কোনো সুরক্ষা না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয়ের নতুন পরিচালক নাহিদা সুলতানা বলেন, ‘আমি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছি। মন্তের মুড়ার বিষয়ে জেনেছি। আগামী অর্থবছরে সম্পূর্ণ খননের উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা আছে।’

জানা যায়, ১৯৫৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের এক জরিপে কুমিল্লায় ৫৪টি প্রত্নস্থলের কথা উঠে আসে। এর মধ্যে ২০টি স্থানে খনন শেষে সংরক্ষণ করা হলেও বাকি ৩৪টি এখনো রয়েছে অরক্ষিত অবস্থায়। মন্তের মুড়া ছাড়াও পাঁচথুবী ইউনিয়নে বৈষ্ণব মুড়া, বসন্ত মুড়া, চ-ী মুড়া ও শিল মুড়া এই চারটি প্রত্নস্থল এখনো গবেষণা ও সংরক্ষণের অপেক্ষায়।

কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর চাইলে এসব এলাকা নিয়মিত খননের মাধ্যমে কুমিল্লার ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরতে পারে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সোহরাব উদ্দিন বলেন, ‘আমরা বৃষ্টিপ্রবণ দেশে থাকি। প্রত্নখনন শুরুর আগে তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য থাকা উচিত। মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া খনন করা হলে প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি প্রজেক্টে মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থীকে কাজের সুযোগ দিলে হবে না। বরং পুরো ব্যাচকে যুক্ত করলে এটি হবে শিক্ষার্থীদের জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, আর দেশের প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও তা কাজে আসবে।