এখনো নানা চাপের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো নানা চাপের মধ্যে রয়েছে—এই বাস্তবতা স্পষ্ট করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। চলমান বৈশ্বিক সংকট, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির গতি এখনও কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছায়নি। তবে এই প্রেক্ষাপটেও আইএমএফ বাংলাদেশকে আরও দুটি কিস্তিতে ১৩৭ কোটি ডলার ঋণ ছাড়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এবার চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থ পাচ্ছে একসঙ্গে। আইএমএফ বোর্ডের সর্বশেষ বৈঠকে এই অর্থ ছাড়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সম্মতি দেওয়া হয়। অনুমোদিত অর্থ আগামীকাল ২৬ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জমা হওয়ার কথা।

এতে বোঝা যাচ্ছে, আর্থিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে বাংলাদেশ কিছু অগ্রগতি দেখাতে পেরেছে, যদিও সামগ্রিক কাঠামোগত সংস্কারে আরও অনেক দূর যেতে হবে। আইএমএফ বরাবরই সুনির্দিষ্ট সংস্কার কর্মপরিকল্পনার ওপর জোর দিয়ে আসছে—এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

আইএমএফের দৃষ্টিতে, অর্থনীতির মূল সমস্যাগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা একটি বড় কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যা গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়, সেটি সামষ্টিক অর্থনীতির ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। যদিও পরে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত হস্তক্ষেপে স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করে।

তবে আর্থিক নীতির কড়াকড়ি, রাজস্ব আদায়ে কাঠামোগত জটিলতা এবং ব্যাংক খাতে চলমান চাপ এখনো কাটেনি। বাণিজ্য পরিবেশেও বাধা বেড়েছে। আইএমএফের মতে, এই চারটি প্রধান কারণে দেশের অর্থনৈতিক ভিত এখনও নড়বড়ে।

চলতি অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৩.৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করছে আইএমএফ। তবে পরবর্তী অর্থবছরে সেটি কিছুটা বাড়বে—প্রায় ৫.৪ শতাংশ পর্যন্ত। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে সহনীয় মাত্রায় আসবে বলেও আশা করা হচ্ছে।

আইএমএফের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি গড়ে ৬.২ শতাংশে নামতে পারে, যা বর্তমানে ৯.৯ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে।

বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য আইএমএফ যে বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে—রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো, স্থিতিশীল ও নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু রাখা, এবং মুদ্রানীতিকে কঠোর রাখার মতো মৌলিক পদক্ষেপ। এসব ব্যবস্থার সমন্বয় দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থনীতির ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে বলে মনে করে সংস্থাটি।

এছাড়া, সরকারি ভর্তুকির খরচ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার তাগিদও রয়েছে। আইএমএফ মনে করছে, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো গেলে রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলা সহজ হবে।

বিভিন্ন জালিয়াতি ও অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রশ্নে আইএমএফ স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, ব্যাংক পুনর্গঠনের জন্য একটি স্পষ্ট, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য আইন এখন জরুরি। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন কাঠামো প্রয়োজন।

উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে হলে বাংলাদেশকে কাঠামোগত সংস্কারের গতিকে জোরদার করতে হবে—এমন বার্তাও দিয়েছে আইএমএফ। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা গড়ে তোলা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং তথ্য-উপাত্তের মান ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ যে অর্থিক সহায়তা পাচ্ছে, তা ব্যবহারের ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের গতিপথ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং কাঠামোগত সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে ধীরগতির অর্থনীতি দ্রুত গতি ফিরে পেতে পারে।