পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) সুকান্ত দাশকে ছেড়ে দেওয়ার প্রতিবাদে এবং পুলিশ কমিশনার ও সিটিএসবির উপ-পুলিশ কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সদর দপ্তর ঘেরাও ও প্রধান ফটকে তালা মেরে বিক্ষোভ করেছে বিক্ষুব্ধ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতা।
কেএমপি সদর দপ্তরের সামনের সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ছাত্রদের মুহুর্মুহু স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা কেএমপির প্রধান ফটকে তালা মেরে দেওয়ার কারণে পুলিশ কমিশনার মো. জুলফিকার আলী হায়দারসহ ঊর্দ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
বুধবার (২৫ জুন) দুপুর সোয়া ২টার দিকে বিক্ষুব্ধ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতা নগরীর খানজাহান আলী সড়কে (কেএমপি) কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেন। ফলে নগরীর খানজাহান আলী সড়কের রূপসা ট্রাফিক মোড় থেকে টুটপাড়া কবরস্থান পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন হাজারো মানুষ।
জানা যায়, খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা থানায় কর্মরত ছিলেন এসআই সুকান্ত দাশ । কিন্তু গত ৫ আগস্ট ছাত্র-গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে চাকরিতে যোগদান না করে তিনি পলাতক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীসহ আন্দোলনরত ছাত্রদের ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
মঙ্গলবার (২৪ জুন) বিকাল সোয়া ৪টার দিকে নগরীর ইস্টার্ন গেট এলাকায় এসআই সুকান্ত দাশকে একটি থ্রি হুইলারে যেতে দেখে বিক্ষুব্ধ জনতা মারপিট করে খানজাহান আলী থানা পুলিশের কাছে তাকে সোপর্দ করে। কিন্তু রাতে পুলিশ তাকে থানা হেফাজত থেকে ছেড়ে দেয়। বুধবার সকালে এসআই সুকান্তের দাশকে ছেড়ে দেওয়ার খবর নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়লে ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। দুপুর সোয়া ২টার দিকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিক্ষুব্ধ বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা কেএমপির সদর দপ্তরের সামনে জড়ো হয়। একপর্যায়ে তারা সদর দপ্তরের প্রধান ফটক বন্ধ করে দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সদস্য ও খুলনা মহানগরের সিনিয়র মুখপাত্র রুমি রহমান বলেন, ‘জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের সময় সোনাডাঙ্গা থানার এসআই সুকান্ত দাশ ছাত্রদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছে। তিনি একাধিক মামলার আসামি। ৫ আগস্টের পর তিনি চাকরিতে যোগদান না করে পলাতক রয়েছেন। মঙ্গলবার বিকালে বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে আটক করে খানজাহান আলী থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করলেও মঙ্গলবার রাতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এসআই সুকান্ত দাশকে গ্রেপ্তার ও অবিলম্বে পুলিশ কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমাদের বিক্ষোভ কর্মর্সূচি চলবে।’
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের খুলনা মহানগর সদস্য সচিব জহুরুল তানভীর বলেন, ‘দেশের তৃতীয় বৃহৎ নগরী খুলনার পুলিশ কমিশনার ব্যর্থ। তিনি খুলনায় আসার পর থেকে এখানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তিনি এসআই সুকান্তের মতো লোককে ছেড়ে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের দোসরদের তিনি গ্রেপ্তার করছেন না। আমরা এমন লোককে খুলনায় দেখতে চাই না। আমরা কেএমপি কমিশনার হিসেবে একজন দেশপ্রেমিক যোগ্য লোককে চাই।’
এদিকে, পুলিশের একটি সূত্র জানায়, এস আই সুকান্ত দাশের বিরুদ্ধে খুলনা সদর থানায় ছাত্র জনতার ওপর হামলার ঘটনায় গত ১২ ডিসেম্বর মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি বর্তমানে ডিবিতে তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনার বাড়ি ভাঙচুরসহ দুটি মামলা চলমান রয়েছে।
খানজাহান আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবীর হোসেন বলেন, ‘মঙ্গলবার এস আই সুকান্ত আদালতে সাক্ষী দিয়ে তার কর্মস্থল চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা থানার উদ্দেশে ফিরছিলেন। তিনি নগরীর ইস্টার্ন গেট এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয়রা তাকে মারধর করেন। পুলিশ ও স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেন। পরে তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে যান। তার বিরুদ্ধে খানজাহান আলী থানায় কোনো অভিযোগ নেই।’
এ ব্যাপারে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মো. জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, ‘এসআই সুকান্তসহ সারাদেশে বহু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে যাদেরই অপরাধ প্রমাণিত হবে- তাদেরকেই গ্রেপ্তার করা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায় না। ছাত্ররা আমার পদত্যাগ চাইছে, আমার পদত্যাগে যদি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, তাহলে পদত্যাগ করতে আমার কোনো অসুবিধা নেই। আমি যথারীতি অফিস করছি। সরকার চাইলে আমাকে যে কোনো সময় উইথ ড্র করে নিতে পারে।’