মঈনুল হাসানের কবিতা

পাঠশালার উঠোনে

আমাদের পাঠশালার উঠোনে

একদিন মায়া কুড়াতে গিয়ে

পেয়ে যাই আশ্চর্য এক

রাতচরা আহত পাখি।

 

ছেঁড়াখোঁড়া ডানার পালকে

রেখে গিয়েছিল তার শরীর সংলাপ

আর পালকের মন, কোমল শরীর।

সাথে রেখেছিল কিছু মুখর শব্দবাগান!

 

পাঠশালার খাতায় খুঁজে খুঁজে

জমা রেখেছিলাম তার বিদীর্ণ ছায়া

এবং সব হারানো কথার ঘুঙুর।

অথচ আমার স্মৃতির বাহানায়

ভুলেছিলাম তার স্বরের আর্তনাদ।

 

আমার এতদিনে জানা হয়ে গেছে

পাখিরা এখানে বাঁচতে আসে না

এসেছিল বুঝি মোহনীয় কোন জাদুবশে

যেমন আমিও এসেছি পথ ভুলে

পাঠ শেখার এই অচল কারাগারে।

ভ্রমণপরিধি

 

বাসনার যতটুকু অবশেষ

তাড়িয়ে নেয় অচেনা ঘূর্ণি হাওয়া,

আর ভাসিয়ে নেয় জলের

অবিরত উল্টোস্রোত।

 

ভেসে যাওয়া নিঃসঙ্গ খড়কুটোর

কোনো জীবন থাকে না।

অনুচ্চারিত ইচ্ছেগুলো ঠাঁই খোঁজে তাই

ভাসমান ভেজা চরের কাছে।

বাঁচার আকাক্সক্ষা অথবা ধারাবাহিক বিসর্জন

দুটোই এখন নিয়তি।

 

হেসে হেসে ভেসে ভেসে

চালচুলোহীন এক ভ্রমণবাসনা

বিন্দু ছাড়িয়ে বৃত্তকে ছুঁতে চায়।

পৃথিবীর দিগন্ত যেখানে শেষ

সে অসীমের হাত ধরে আবারও পথ হাঁটি

অবিরাম অনিঃশেষ।

 

জন্মের বহু আদি জন্ম থেকেই

ভালোবেসে সন্তর্পণে;

এমনিভাবে গুছিয়ে রেখেছি

ক্লান্তিহীন এক ভ্রমণপরিধি।

চোখ

 

আমার কিছু চোখ

অহর্নিশি জেগে থাকতে জানে

খুব বিশ্বস্ত কোনো প্রত্যঙ্গের মতো;

ঠিক যতখানি আলো এসে বিচ্ছুরিত হয়

অকপট দৃশ্যগ-ির মধ্যে

তার অধিক দেখার নিয়ম নেই তার।

 

অথচ চোখগুলো জানে

বিশ্বস্ততা ভালো, তবে কোনো দাসত্ব নয়

তাই গোলাকার মুখমন্ডলে লেগে থাকে ঠিক।

কিন্তু কখনো আবার অন্যের ইচ্ছাধীন হয়ে

পরাভূত হয় অন্ধকারের সময়সংহারে;

লোভের ইশারায় হয়তো বিভ্রান্ত হয়ে ওঠে

অবিশ্বস্ত রাতেরই মতো।

 

এখানে রাত প্রভুভক্ত কুকুরের ন্যায়

পা কিংবা হাঁটুভাঙা কোলের কাছে

গন্ধ শুঁকে নাক ঘষছে অবিরাম

বেহিসাবি কিছু আদরের বাহানায়;

রাতের শরীরে প্রহরী বেষ্টিত চোখ

বোধের তরজমায় সতর্ক তখন কিংবা সবকিছু জানে।

হঠাৎ তখন জ্বলে ওঠে আগুনের ফুলকি

একটা দুটো তারা খসে পড়ে অদূরের দূরে

নিরাপদ চরাচরের সামান্য অবিশ্বস্ততায়।

 

রাতও জানে দিনশেষে

সময়ের সঙ্গম ভালো, তবে দাসত্ব নয়

তবু কিছু রাত প্রতিদিন পরাজিত হয়

কারও কারও কাছে মেনে নেয় অন্যায় দাসত্ব।

আলো অন্ধকার নির্বিশেষে

রাতের শরীরে তখন পাপ জাগে

খুব বিশ্বস্ত গোপন ও নিয়মের অনিবার্যতায়।

 

এমনই নানান ফাঁকির মধ্যে

আমার কিছু করার থাকে না;

নিয়ম করে আজকাল তাই

মুখ থেকে খুলে রাখি যাবতীয় চোখ।

বিশ্বস্ত অথবা অবিশ্বস্ত রাতের কোথাও

আলোর নিঃশর্ত চলাচল রাখি না।

দেখি শুধু মুখম-লের

কোটরাগত অন্ধকারের মধ্যে

খসে পড়া অন্ধ নক্ষত্রসমূহ

একা বসে জ্বলজ্বল করছে।