টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম বলটা খেলেছিলেন শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুত। ২০০৪ সালে ক্রিকেট ছেড়ে পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করছেন একসময়ের এই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। দেশ রূপান্তর-এর সামীউর রহমানকে জানিয়েছেন এই সময়ের ক্রিকেট নিয়ে তার ভাবনার কথা
প্রশ্ন: অভিষেক টেস্টের দলে যারা ছিলেন তাদের ভেতর খুব সম্ভবত আপনি এবং বিকাশ রঞ্জন দাস (মাহমুদুল হাসান) সরাসরি ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত নেই। বাকিরা সবাই কোচিং কিংবা নির্বাচক-সহ বিভিন্ন ভূমিকায় ক্রিকেটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অনেকদিন পরেই কি দেখা হলো সবার সঙ্গে?
শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুত: আমার সঙ্গে অনেকেরই নিয়মিত যোগাযোগ আছে। আতাহার ভাই (আলী খান), আকরাম ভাই (খান), পার্থ ভাই-সহ বেশ কয়েকজন মিলে আমেরিকাতে একটা ট্যুর করেছিলাম গত বছর। ওখানে আমরা নিউ ইয়র্কে, মিশিগানে ম্যাচ খেলেছি। নারায়ণগঞ্জে যে মাস্টার্স ক্রিকেটটা হয়, সেটার প্রেসিডেন্ট হলাম আমি। নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সেক্রেটারি আমি। নারায়ণগঞ্জ ক্রিকেট লিগটা আমাদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান প্যারাডাইজ কেবল থেকে আমরা করতাম, যদিও লিগটা ২ বছর ধরে হচ্ছে না। খেলাধুলার সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত আছি, তবে আমি নারায়ণগঞ্জেই কাজ করি। যেমন আমাদের এখানে একটা অ্যাকাডেমি আছে যেটা আমি, জাহাঙ্গীর আলম (সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার) ও জাকারিয়া ইমতিয়াজ মিলে চালাই। এটা আমাদের হাতে গড়া। আমি প্রথম প্রথম খেলাধুলায় অনেক সময় দিতাম, তবে ২০০৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের পর নির্বাচকদের সঙ্গে একটু ঝামেলা হওয়ার কারণে আমি অবসর নিয়ে নিই। এরপর আমি পারিবারিক ব্যবসায় যোগদান করার পর খেলার সঙ্গে আছি বলতে প্রীতি ম্যাচ খেলতাম, মাস্টার্স ক্রিকেট খেলতাম যেখানে ফারুক ভাই (আহমেদ, সাবেক বিসিবি প্রেসিডেন্ট) খেলত, আতাহার ভাই খেলত। এছাড়া খেলা স্পন্সর করতাম, বাচ্চাদের খেলা আয়োজন করতাম, এইবারও বাচ্চাদের অনূর্ধ ১২ : ১৪ এই বয়সের তিনটা টুর্নামেন্ট করেছি আমাদের অর্থায়নে। আমাদের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে, বন্ধুবান্ধবরা একেকটা কোম্পানি থেকে স্পন্সর করে একেকটা টুর্নামেন্ট করতাম। কোয়াব নারায়ণগঞ্জেরও প্রেসিডেন্ট আমি। এভাবে ক্রিকেটের সঙ্গে আছি। এইবার বিসিবি’র প্রোগ্রামে (টেস্ট মর্যাদার ২৫ বছর পূর্তিতে) বলে আসছি, আমাদের যদি দরকার হয় তাহলে বিনা পয়সায় ক্রিকেটের জন্য কাজ করে দেব, কোনো টাকা-পয়সা দিতে হবে না।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে প্রথম বলটা খেলেছিলেন আপনি। তখন ক্রিকেটকে ঘিরে আপনার যে রোমাঞ্চ আর এখন যখন টিভিতে বাংলাদেশের খেলা দেখেন, তখন কী মনে হয় আপনার?
বিদ্যুত: আমার একটা দুঃখ আছে যে আমার ইচ্ছা ছিল তামিম ইকবালের সঙ্গে একসঙ্গে ইনিংস ওপেন করব। ওয়ানডে হোক বা টেস্ট হোক, ওর সঙ্গে পার্টনার হয়ে ওপেন করব। আমি যখন অবসর নিই, তার পরে বোধহয় সে জাতীয় দলে আসে। ওর সঙ্গে পরে আমার একবার কথা হয়েছিল, এই শখটা পূরণ হয়নি। যেটা বললেন, যে প্রথম বলটা আমি খেলেছি; তখন তো এত টেস্ট বা ওয়ানডে হতো না; বছরে ২টা-৪টা ওয়ানডে খেলতাম। আমরা অন্য খেলা বেশি খেলতাম, এসিসি বা আইসিসি ট্রফি এই সব খেলতাম, কয়েক বছর পর পর এশিয়া কাপ হতো, ৬ মাস পরে পরে হয়তো জিম্বাবুয়ে বা কেনিয়া আসত। এখন মনে হয় ১৫০ এর বেশি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ, (১৫৪তম টেস্ট চলমান), এই খেলোয়াড়দের মতো সুযোগ পেলে আমাদের গায়েও এখন ৫০ থেকে ৭০টা টেস্ট থাকত। তখনকার নির্বাচকরা যদি আমাদের ওপর ভরসা করত, আমরা তো খারাপ ক্রিকেটার ছিলাম না! কিন্তু আমরা এভাবে সুযোগ পেতাম না। তিনটা ম্যাচ খারাপ করলে বসিয়ে দিত, এখন দেখি ৩টা ম্যাচ খারাপ করলেও কিছু হয় না দেখি খেলছে। আবার দলে চলে আসে। এসব অনেক দুঃখ আছে, এসব নিয়ে আর ভাবি না, যেহেতু অবসর নিয়ে নিয়েছি। এখন চাই টেস্ট-ওয়ানডে-টি-২০ সবকিছুতেই বাংলাদেশ ভালো করুক। ও রকম আফসোস নেই। চাই দল নির্বাচন প্রক্রিয়া ভালো হোক, কোনো বৈষম্য না থাকুক। নির্বাচকরা যেন যৌক্তিকভাবে দল নির্বাচন করেন।
প্রশ্ন: এখন তো ক্রিকেট খেলে আর্থিকভাবেও অনেক লাভবান হওয়া যায়। ম্যাচ ফি’র বাইরে জাতীয় দলের বেতন, ঢাকা লিগ, এনসিএল, বিপিএল মিলিয়ে শীর্ষ পর্যায়ের ক্রিকেটারদের বার্ষিক আয় ৪:৫ কোটি টাকার কম নয়। অভিষেক টেস্টে আপনি ম্যাচ ফি কত টাকা পেয়েছিলেন?
বিদ্যুত: আমার এতটা মনে নেই। আমাদের কিন্তু বেতনও শুরু হয়েছিল, আমাদের দিয়েই খুব সম্ভবত। এ গ্রেডে মনে হয় বেতন ছিল ৬০:৭০ হাজার টাকা, বি গ্রেডে মনে হয় ৫০ হাজার টাকা আর সি গ্রেডে ২৫:৩০ হাজার টাকা। ঢাকা লিগে টাকার পরিমাণ ভালো ছিল, আমরা মৌসুমে ৭:৮ লাখ টাকাও পেয়েছি। এরপর অফিস লিগ ছিল, তখন আমরা বেক্সিমকোতে খেলতাম কিংবা কোনো একটা ব্যাংকে খেলতাম, দেখা গেছে ওরা আমাদের ১ বছরের বেতন দিয়ে দিত। জাতীয় দলে ও রকম টাকা ছিল না। তখন আমরা খ্যাপ খেলতাম প্রচুর। আমি আর বুলবুল ভাই (আমিনুল ইসলাম বুলবুল, বিসিবি সভাপতি) অনেক খ্যাপ খেলেছি একসঙ্গে। বছরে সব মিলিয়ে ১০:১৫ লাখ টাকার মতো আয় হতো, তবে আমার যে ব্যাকগ্রাউন্ড তাতে আমি টাকার জন্য ক্রিকেট খেলিনি। আকরাম ভাই আবাহনীতে খেলে বছরে ৮ লাখ টাকা মনে হয় পেতেন, আমি যতটুকু জানি। নান্নু ভাইও ও রকম পেতেন, ৭:৮ লাখ টাকা। এখন তো শুনেছি সাকিবকে (আল হাসান) মোহামেডান ১ কোটি টাকাও দিয়েছে। এরপর প্লেয়ারদের বিজ্ঞাপন থেকেও আয় আছে। আমাদের সময়ে বছরে আমরা ১০ লাখ টাকা দেখতাম চোখে, তবে হিসাব করলে সেই ১০ লাখ টাকা এখন অনেক টাকা।
প্রশ্ন: এখন ক্রিকেটে যে আয় বা খ্যাতি, আপনার কি মনে হয় অল্পতেই এখনকার ক্রিকেটাররা সন্তুষ্ট হয়ে যাচ্ছেন?
বিদ্যুত: আপনি ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে তারা তো বাংলাদেশের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি উপার্জন করে। যদিও ভারতে একটা ক্রিকেটারের জাতীয় দলে আসাটা আমাদের চেয়ে ১০০ গুণ কঠিন। অনেক মানুষ, তবুও তো বাংলাদেশে ক্রিকেটাররা চলে আসে জাতীয় দলে। এই যে ১০৭ জন টেস্ট ক্রিকেটার বাংলাদেশের, তাদের অনেককেই আমি বলব যে টেস্ট খেলার উপযোগী ছিল না। আমরা অনেক কিছু খেলে এরপর জাতীয় দলে এসেছি। আর এমন অনেক প্লেয়ার আছে, ১ মৌসুম ঢাকা লিগ খেলেই জাতীয় দলে চলে আসছে। ভারতে খেলোয়াড়রা অনেক সংগ্রাম করে। ওরা রঞ্জি ট্রফি, ঘরোয়া আরও টুর্নামেন্ট এসব অনেক কিছু খেলে, সেখানে ২০০ জন পারফর্ম করে, নেয় মাত্র ১ জন বা ২ জনকে। আমাদের দেশে কী হয়, ১ বছর প্রিমিয়ার লিগ ভালো খেললেই তাকে জাতীয় দলে ঢুকিয়ে দেয়। এমনও প্লেয়ার আছে, ২০টা ওয়ানডে খেলেছে, ৫টা টেস্ট খেলেছে, রানে নেই প্রিমিয়ার লিগে ২টা ম্যাচে ভালো করলে আবার জাতীয় দলে ঢুকে যায়। আমার মনে হয় আরেকটু তৈরি হয়ে জাতীয় দলে এলে ভালো। আরেকটু বুঝে প্লেয়ারদের জাতীয় দলে নেওয়া ভালো।