গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বাহিনীর ধারাবাহিক বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৯৫ জন ফিলিস্তিনি। হামলার শিকার হয়েছেন নারী, শিশু, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ত্রাণের আশায় দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় মানুষ পর্যন্ত। একাধিক স্থানে—ক্যাফে, স্কুল, ত্রাণকেন্দ্র ও হাসপাতাল চত্বরে চালানো এসব হামলায় আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানায়।
গতকাল সোমবার রাতে চালানো এই ভয়াবহ হামলার কেন্দ্রবিন্দু ছিল উত্তর গাজার আল-বাকা নামের সমুদ্রতীরবর্তী একটি ক্যাফে। সেখানে একটি শিশুর জন্মদিন উপলক্ষে বহু মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। সেই নিরীহ সমাবেশে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে বোমা ফেললে একসঙ্গে প্রাণ হারান ৩৯ জন। নিহতদের মধ্যে সাংবাদিক ইসমাইল আবু হাতাবও ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা ছাড়াই হামলাটি চালানো হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াহিয়া শরিফ বলেন, “আমরা ছিন্নভিন্ন মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছি। এই জায়গার সঙ্গে কোনো সামরিক সম্পর্ক ছিল না। একটি শিশুর জন্মদিন পালন হচ্ছিল মাত্র।”
এছাড়া গাজা শহরের ইয়াফা স্কুলে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুতদের ওপরও হামলা চালানো হয়। কয়েকশ মানুষ সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। হামাদা আবু জারাদে নামে একজন জানান, হামলার মাত্র পাঁচ মিনিট আগে তারা সরে যাওয়ার নির্দেশ পান। তিনি বলেন, “আমরা আর কোথায় যাব, বুঝে উঠতে পারছি না। বিগত ৬৩০ দিনেরও বেশি সময় ধরে কোনো সহায়তা পাইনি, প্রতিদিন মৃত্যুর মুখে দিন কাটাচ্ছি।”
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকাতেও চালানো হয় আরেকটি হামলা। টার্গেট করা হয় আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের আশপাশের এলাকা, যেখানে কয়েক হাজার পরিবার নিরাপত্তার আশায় অবস্থান করছিল। হামলার সময় পুরো এলাকা ছড়িয়ে পড়ে বিশৃঙ্খলায়, মানুষ দৌঁড়ে পালাতে শুরু করে।
আল জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজজুম জানান, “এই হাসপাতালে আগেও অন্তত ১০ বার হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলা কার্যত গাজার ধুঁকতে থাকা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আরেকটি ভয়াবহ আঘাত।”
গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিসে ‘গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)’ পরিচালিত একটি ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়। সেখানে খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর চালানো এই হামলায় ১৫ জন নিহত হন, আহত হন আরও অন্তত ৫০ জন।
আল জাজিরা জানায়, গত মে মাসের শেষ দিক থেকে সীমিত পরিসরে গাজায় ত্রাণ বিতরণ শুরু করে জিএইচএফ। এর পর থেকে প্রতিদিনই এসব কেন্দ্রে হামলায় প্রাণহানি ঘটছে। এখন পর্যন্ত ওইসব স্থানে চালানো হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৬০০ জন এবং আহত হয়েছেন ৪ হাজারেরও বেশি।
এদিকে ইসরায়েলের প্রভাবশালী পত্রিকা হারেৎজ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ইসরায়েলি সেনাদের নিরস্ত্র ত্রাণপ্রার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে বলা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সেনা জানিয়েছেন, কোনো হুমকি না থাকা সত্ত্বেও তাঁদের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও সহিংসতার নির্দেশ দেওয়া হয়।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস এক বিবৃতিতে বলেছে, “আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের ভেতরে শরণার্থীদের জন্য বানানো একটি তাঁবুতে ইচ্ছাকৃতভাবে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। এতে শুধু রোগী নয়, আশ্রয়প্রার্থীরাও চরম বিপদের মধ্যে পড়েছে। এটি গাজার স্বাস্থ্যখাতকে টার্গেট করে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক হামলার অংশ।”
অবরুদ্ধ গাজায় এই নিস্তব্ধ মৃত্যুর মিছিল প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের চাপ ও যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও বাস্তবতা বলছে, মাঠে প্রতিদিন নতুন করে রক্ত ঝরছে।