সখীপুরের সুস্বাদু কাঁঠাল যাচ্ছে সারা দেশে

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বিভিন্ন হাটে সুস্বাদু কাঁঠালের বাজার এখন রমরমা। উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে-কানাচে। প্রতি সপ্তাহেই এখান থেকে প্রায় কোটি টাকার কাঁঠাল যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের নানা প্রান্তে। স্বাদে মিষ্টি ও পুষ্টিগুণে ভরপুর এই জাতীয় ফলটি শুধু রসনাতৃপ্তিই নয়, স্বাস্থ্য সচেতনতার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সখীপুরে ৮৫০ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের চাষ হয়। পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় রয়েছে কাঁঠালগাছ। বাড়ির এসব গাছ থেকেই প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত ও বাজারজাত হয়। উপজেলার কুতুববপুর, বড়চওনা, কচুয়া, মহানন্দপুর, নলুয়া, দেওদীঘি ও তক্তারচালা- এই সাতটি হাটে নিয়মিত মৌসুমি ফল কাঁঠাল সবচেয়ে বেশি বেঁচাকেনা হয়। ফলে পুরো উপজেলা জুড়ে কাঁঠাল বাণিজ্যের আনুমানিক মূল্য সপ্তাহে কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

Sakhipur (Tangail) News pic-1 02.07.25

খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কতুবপুর হাট সারা বছর কলার জন্য পরিচিত থাকলেও জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত কাঁঠালের হাটে রুপ নেয়। এ হাটটি সপ্তাহের শনিবার, রবিবার, মঙ্গলবার ও বুধবার বসে। বড়চওনার হাট সোমবার, কচুয়া রবিবার ও বুধবার, মহানন্দপুর মঙ্গলবার, নলুয়া বৃহস্পতিবার, দেওদীঘি সোমবার এবং তক্তারচালা হাট বসে শনিবার। একেকটি হাটে সপ্তাহে গড়ে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার কাঁঠাল বেঁচাকেনা হয়। সব মিলিয়ে প্রতি সপ্তায় সখীপুর থেকে প্রায় কোটি টাকার কাঁঠাল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে।

সরেজমিন সবচেয়ে বৃহৎ কুতুবপুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, সাগরদিঘী-ঢাকা সড়কের দুই পাশে শত শত ভ্যানগাড়িতে কাঁঠাল ভর্তি করে বিক্রির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। পাইকারী ক্রেতারা কাঁঠাল কিনে স্তুপ করে রেখেছেন।

পরে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাটের আগের দিন বিকাল থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত কৃষক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা কাঁঠাল হাটে নিয়ে আসেন। পাইকারেরা আনুমানিক মূল্যে দর-কষাকষি করে কাঁঠাল ক্রয় করেন। এরপর সন্ধ্যা হলেই ট্রাকযোগে সেগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠিয়ে দেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নান মিয়া জানান, তারা সখীপুরের বিভিন্ন গ্রাম থেকে কাঁঠাল কিনে হাটে পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। প্রতিটি কাঁঠালের দাম আকারভেদে ৩০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। খুচরা ব্যবসায়ীরা গাছ থেকে প্রতিটা কাঁঠাল ২০ থেকে ৫০ টাকায় কিনে সংগ্রহ করেন।

উপজেলার মহানন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আলী বলেন, এ বছর কাঁঠালের উৎপাদন তুলনামূলক ভালো। তিনি কাঁঠাল ছোট থাকা অবস্থায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে কিছু গাছ বিক্রি করে দিয়েছেন। বেশ কিছু গাছের কাঁঠাল এখন বিক্রি হচ্ছে। তিনি এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার টাকার কাঁঠাল বিক্রি করেছেন।

কুতুবপুর হাটের ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন জানান, প্রতি বছর ভরা মৌসুমে এ হাট থেকে ১৫-২০ ট্রাক কাঁঠাল দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়।

প্রতি হাটে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকার কাঁঠাল কেনাবেঁচা হয়। নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা পাইকার আব্দুল জলিল জানান, তিনি প্রতি সপ্তাহে এক ট্রাক কাঁঠাল (প্রায় দুই হাজার পিস) কিনে ঢাকায় নিয়ে যান। সারা সপ্তাহে বিক্রি করে কিছু লাভ থাকে বলে মুচকি হাসি দেন।
বাজার সংশ্লিষ্ট কয়েকজন আড়াতদার জানান, কাঁঠালের হাট ঘিরে উপজেলায় মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রতি মৌসুমে প্রায় ২০০-২৫০ জনের কর্মসংস্থান হয়। কেউ মাঠ পর্যায়ে কাঁঠাল সংগ্রহ করে, কেউ ভ্যানে বহন করে, আবার কেউ পাইকারি ক্রেতাদের জন্য ট্রাকে তোলার কাজ করেন।

তবে কৃষক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা কাঁঠালের দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি গাছ থেকে কাঁঠাল সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাত করতে যে খরচ হয়, তার তুলনায় বিক্রিতে লাভ খুবই সামান্য, ফলে অনেকেই আগ্রহ হারাচ্ছেন।

এ বিষয়ে সখীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মন জানান, সখীপুরের লাল মাটি কাঁঠাল চাষের জন্য আদর্শ। এখানকার কাঁঠাল সুস্বাদু হওয়ায় চাহিদাও বেশি। কাঁঠালের প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে গবেষণা চলছে। সখীপুরে বাণিজ্যিকভাবে কাঁঠাল চাষ করে কৃষকরা ভালো লাভবান হতে পারেন। তারা কৃষকদের সেভাবে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছেন।