সিলেটের পাথর কোয়ারি বন্ধ, স্টোন ক্রাশার মেশিনে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন ও সড়ক সম্প্রসারণে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের মতো সরকারি পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী। এসব সিদ্ধান্তের জন্য তিনি সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে সরাসরি দায়ী করে তার অপসারণ দাবি করেছেন।
গতকাল বুধবার নগরীতে পাথর ব্যবসায়ী ও মেজরটিলা এলাকায় উচ্ছেদের শিকারদের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘জেলা প্রশাসক, তুমি কোথাকার কে? তোমার মতো কয়েকজন জেলা প্রশাসক আমার আন্ডারেই চাকরি করেছে; কথাবার্তা সাবধানে বলবা। জনপ্রতিনিধি কে আছেন, কে থাকবে সেটা নির্ধারণ করবে জনগণ, তোমার নির্ধারণ করার কথা না।’
সমাবেশে পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়াসহ পাঁচ দফা দাবি তোলা হয়। পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, শুক্রবারের মধ্যে ডিসিকে অপসারণ না করা হলে শনিবার থেকে সিলেটের সব সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে। দাবি না মানলে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিবহন ধর্মঘটের ঘোষণাও দেন।
বক্তারা বলেন, প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির নামে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা শ্রমিক ও মালিকদের বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সমাবেশে পাঁচটি দাবি উপস্থাপন করা হয়: পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়া, স্টোন ক্রাশার ধ্বংসের অভিযান বন্ধ, পাথরবাহী ট্রাক আটক না করা, চালকদের হয়রানি বন্ধ এবং জেলা প্রশাসকের অপসারণ।
আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘সম্প্রতি কোনো নোটিশ ছাড়াই জেলার বিভিন্ন স্থানে পাথর ভাঙার যন্ত্রের বৈধ বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে প্রশাসন। একইভাবে মেজরটিলা এলাকায় একটি মার্কেটসহ রাস্তাঘেঁষা অনেক স্থাপনাও উচ্ছেদ করা হয়েছে। ডিসি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নষ্ট করছেন। এজন্য ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ তাকে সরানোর দাবি জানাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বুধবার ডিসি পাথর সংশ্লিষ্টদের নিয়ে এক বৈঠকে ডাকেন। কিন্তু যারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত, সেই ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতারা কেউই বৈঠকে অংশ নেননি। নির্যাতন চালানোর পর এখন আলোচনার ডাক দেওয়া হচ্ছে। তাই ঘৃণাভরে বৈঠক প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। দাবি আদায় না হলে সিলেটের অর্থনীতি অচল হয়ে পড়বে। আমরা পরিবেশের পক্ষেই রয়েছি। তবে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের ক্ষতিও চাই না। তাই পরিবেশবান্ধবভাবে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া জরুরি।’ তিনি ৪ জুলাইয়ের মধ্যে ডিসিকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন।
সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন আহমদ মাসুকের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই সমাবেশে বক্তব্য দেন—কেন্দ্রীয় বিএনপির ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সহসম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রাজ্জাক, জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমদ চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি সাদিকুর রহমান, জেলা সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি ময়নুল ইসলাম, বাস-মিনিবাস কোচ মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রহিম, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সহসম্পাদক মো. আবদুস সালাম এবং জেলা শ্রমিক দলের সদস্যসচিব নুরুল ইসলাম।
অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পাথর কোয়ারিগুলো ইজারা দেওয়া এবং স্টোন ক্রাশার মেশিনের বিদ্যুৎসংযোগ পুনঃস্থাপনের দাবিতে ব্যবসায়ী-শ্রমিকরা সম্প্রতি বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলা প্রশাসক বুধবার দুপুরে বৈঠকে বসেন, যেখানে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাসহ পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ভিত্তিতেই পাথর ভাঙার যন্ত্রের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি সিলেট-তামাবিল আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণের অংশ হিসেবে সড়ক ও জনপথ বিভাগ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করছে। সরকারি কর্মকর্তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। এমন অবস্থায় হঠাৎ আমার অপসারণ দাবি করা দুঃখজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরিফুল হক চৌধুরী এ বিষয়ে আমার কাছে আসেননি। কেন তিনি এমন বক্তব্য দিচ্ছেন, সেটা তাকে জিজ্ঞাসা করলেই ভালো জানা যাবে। আমি এই বিষয়ে কিছু জানি না।’
উল্লেখ্য, গত ১৪ জুন জাফলংয়ে পরিবেশ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও ফাওজুল কবির খানের গাড়িবহর আটকে দিয়ে পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ হয়। ওই ঘটনায় নয়জনকে নামীয় এবং ১৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন পাথর মিলের বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।