স্টিভ ওয়াহর আত্মজীবনীর নাম ‘আউট অব মাই কমফোর্ট জোন’। অস্ট্রেলিয়ার সর্বজয়ী এই অধিনায়ক তার আত্মজীবনীতে অকপটে স্বীকার করেছেন, নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের গণ্ডি ভেঙে তারপরই তাকে সামলাতে হয়েছে বিশ্বসেরা হয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের দলের ব্যাটসম্যানরা নিজেদের সেই ‘কমফোর্ট জোন’ থেকেই বের হতে চাইছেন না, যে কারণে সামান্য প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেই তাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। কলম্বোয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডেতে ৫ রানে ৭ উইকেট হারানোর ব্যাখ্যায় এটাই বলেছেন বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের হাইপারফরম্যান্স দলের ব্যাটিং কোচ রাজিন সালেহ। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপে তিনি জানিয়েছেন, এখন লিটন দাসকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিরতিতে পাঠানোই তার ব্যাপারে সবচেয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত।
বুধবার আর. প্রেমাদাসায় ২৪৫ রান তাড়া করতে গিয়ে ১ উইকেটে ১০০ রান, সেখান থেকে বাংলাদেশ ৮ উইকেটে ১০৫। অর্থাৎ ৫ রান তুলতে নেই ৭ উইকেট। এই অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডের কোনো ব্যাখ্যা হয় না, হয় না কোনো বিশ্লেষণও। যুক্তরাষ্ট্র বনাম নেপাল ম্যাচে ২০২০ সালে ঘটেছিল এ রকম এক অদ্ভুত কাণ্ড, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ৭ উইকেট হারিয়েছিল ৮ রান তুলতে, ১ উইকেটে ২৩ রান থেকে তারা ৮ উইকেটে ৩১ রানে পরিণত হয়েছিল কীর্তিপুরের মাঠে। সেদিনও এই ধসের পেছনের কারিগর ছিলেন একজন লেগস্পিনার ও সন্দ্বীপ লামিচানে। তবে প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের মতো পরিচর্যিত মাঠে, বাংলাদেশের মতো অভিজ্ঞ দল যখন ১ উইকেটে ১০০ রান করে ম্যাচ জয়ে সম্ভাবনায় এগিয়ে, তখন কামিন্দু মেন্ডিস আর ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা মিলে স্কোরকার্ডটাকে ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে দিয়েছেন। কেন এমন হলো, কারণটা জানতে চাইলে রাজিন বলেন, ‘আমার মনে হয় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা প্রতিকূল পরিবেশের চ্যালেঞ্জটা নিতে চান না। তারা সবকিছু সহজ চান। প্রিমিয়ার লিগেও দেখেছি, যখন কোনো মাঠের উইকেট একটু স্পিন ফ্রেন্ডলি হয়, তখন জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা গিয়ে কিউরেটরকে গালাগাল করে। কেন? আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কি সবসময় নিজের ইচ্ছেমতো উইকেট পাওয়া যাবে? একজন পেশাদার খেলোয়াড়কে একটা ক্লাব সই করায় তার কাছ থেকে পারফরম্যান্স পাওয়ার আশায়। উইকেট যেমনই হোক, তাকে সেখানে টিকে থেকে রান করতে হবে, এটাই হওয়া উচিত মানসিকতা। আমরা টার্ফের উইকেটে খেলে, কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে নিজের খেলার মান উন্নীত করেছিলাম, এখনকার ক্রিকেটারদের সেই চেষ্টা বা দায়বদ্ধতা নেই।’
ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় লেগস্পিনার না থাকার কারণেই কি হাসারাঙ্গাকে ভয় পেয়ে এভাবে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসা? এমন প্রশ্নে রাজিনের ব্যাখ্যা, ‘হাসারাঙ্গা কেন, কোনো স্পিনারকেই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা ঠিকমতো খেলতে দিচ্ছে না। কারণ ঘরোয়া ক্রিকেটে স্পিনাররা বল ঘোরানোর সুযোগই পান না, উইকেট একটু টার্নিং হলেই কিউরেটরদের ওপর চোটপাট শুরু হয়। হাসারাঙ্গা কি শেন ওয়ার্ন যে লেগ স্টাম্পের বাইরে থেকে বল স্টাম্পে লাগাবে? সে কি তার চেয়েও বড় মাপের স্পিনার? আমাদের ক্রিকেটাররা কি শেন ওয়ার্নকে খেলেনি? আসল কথা হচ্ছে, এখনকার ক্রিকেটারদের ভেতর দায়িত্ববোধের অভাব, জবাবদিহির অভাব। কেউ একজন উইকেটে একটু সময় নিল না, এটা ওয়ানডে ম্যাচ। ম্যাচের তিন ভাগের দুভাগই তখনো বাকি। সবাই এমন তাড়াহুড়ো করে ব্যাটিং করল, যেন খুব বেশি বল বাকি নেই। একজনও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিল না, এটা দুঃখজনক।’
মিডল অর্ডারের ভাঙন সম্পর্কে রাজিনের অভিমত, ‘আমাদের আসলে প্রপার মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান নেই, যেমন ছিল মুশফিক বা মাহমুদউল্লাহ। তবে সব দলেই পরিবর্তন আসে। আমার মনে হয়, লিটন ঠিক মিডল অর্ডারের উপযোগী না, সে ওপেন বা তিনে ঠিক আছে। চারে সে যেতে পারে, যদি খুব দ্রুত তিন উইকেট পড়ে যায় তখন। কিন্তু মিডল অর্ডারে স্পিন খেলার মতো জায়গায় সে এখন আর নেই। তার যে পারফরম্যান্স, তাতে করে তাকে কিছুদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে রাখা দরকার। সে পারফর্ম করুক, ফর্মে ফিরুক তারপর দলে আসুক।’
রাজিন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন জাকের আলী অনিকের ব্যাটিং, ‘জাকের কীভাবে খেলেছে দেখেছেন। একজন ব্যাটসম্যান থাকলেই ম্যাচটা বের করে আনা যেত। সে ডিফেন্স করতে জানে। আমাদের বেশিরভাগ ব্যাটসম্যান স্পিনের বিপক্ষে ডিফেন্স করেই জানে না।’ এই একই ভেন্যুতে পরের ম্যাচ, সেই ম্যাচেও কি কাজ করবে ধসের আতঙ্ক? রাজিন বললেন, ‘কাজ করতে পারে। তবে হাসারাঙ্গাকে ভয় না পেয়ে সাহস নিয়ে খেলতে হবে, নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বের হতে হবে। তাহলেই এই ভয় কাটানো যাবে।’
রাজিনের পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা অনুশীলনেই নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বের হতে চান না!