ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় খাদ্য সহায়তা নিতে গিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭৪৩ জন, আহত হয়েছেন প্রায় পাঁচ হাজার। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ তথ্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমর্থনে পরিচালিত বিতর্কিত সহায়তা কর্মসূচি ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ (জিএইচএফ)। গতকাল শনিবার সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ চিত্র।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেবে, জিএইচএফ-এর খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় ইসরায়েলি সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর হামলায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৭৪৩ জন ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৮৯১ জন।
আল জাজিরার গাজা সিটি প্রতিনিধি হানি মাহমুদ বলেন, ‘এটি নিছক একটি প্রাথমিক হিসাব। বাস্তবে হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। মানুষ যখন খাদ্যের জন্য বাঁচার শেষ চেষ্টায় আসে, তখনই হামলা শুরু হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষুধায় মানুষ কাতর। অনেক মা নিজে না খেয়ে সন্তানের জন্য খাবার জমিয়ে রাখছেন। বহু পরিবার দিনের পর দিন অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।’
উল্লেখ্য, গত মে মাসের শেষ দিকে চালু হওয়া জিএইচএফ প্রকল্প শুরু থেকেই বিতর্কের জন্ম দেয়। বিভিন্ন সূত্র বলছে, এই প্রকল্পের নিরাপত্তাকর্মী এবং ইসরায়েলি সেনারা খাদ্য নিতে আসা মানুষদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে।
বার্তাসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, প্রকল্পটিতে নিযুক্ত কয়েকজন মার্কিন ঠিকাদার নিজের চোখে দেখেছেন নিরাপত্তাকর্মীরা ‘অস্ত্র নিয়ে খামখেয়ালি আচরণ করছে।’
তবে জিএইচএফ সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, ‘এই দাবিগুলো সত্য নয়। আমরা আমাদের প্রতিটি সাইটের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করি।”
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জিএইচএফ-এর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘গাজায় কার্যকরভাবে খাদ্য পৌঁছাতে সক্ষম একমাত্র সংস্থা জিএইচএফ।’
জুন মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রকল্পটিতে ৩০ মিলিয়ন ডলার সরাসরি অনুদান দেয়। তবে একই সময়ে সহিংসতার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। শনিবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে জিএইচএফ-এর একটি বিতরণ কেন্দ্রে গ্রেনেড হামলায় আহত হন দুজন মার্কিন কর্মী। বর্তমানে তারা স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন।
ব্রিটেনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই প্রকল্পকে বর্ণনা করেছে ‘অমানবিক, প্রাণঘাতী ও সামরিকীকৃত একটি উদ্যোগ’ হিসেবে। সংস্থাটির ভাষ্য, ‘জিএইচএফ প্রকল্প আন্তর্জাতিক উদ্বেগ প্রশমনের একটি মুখোশ মাত্র—মূলত এটি ইসরায়েলি গণহত্যার আরেকটি রূপ।’
মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো এই সহায়তা প্রকল্প অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সহায়তা কেন্দ্রগুলো এমনভাবে সামরিকীকরণ করা হয়েছে, যেখানে গাদাগাদি করে রাখা মানুষের ওপর প্রতিদিনই গুলি চালানো হচ্ছে। খাদ্য, পানি ও ওষুধের চরম ঘাটতির কারণে ফিলিস্তিনিরা বাধ্য হয়ে এই সহায়তা নিতে গেলেও সেখানে গিয়ে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।
গাজাবাসী মাজিদ আবু লাবান বলেন, ‘আমার ছেলেমেয়েরা টানা তিন দিন না খেয়ে ছিল। তাদের জন্য খাবার আনতেই আমি জিএইচএফ-এর সহায়তা কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হই। রাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেটসারিম করিডোর ধরে রওনা দিই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলি সেনারা আমাদের ওপর গোলা ছুড়তে শুরু করে। সবাই প্রাণ বাঁচাতে দৌঁড়ে পালাতে থাকে।’