গিলের ৪৩০ রানের পর আকাশ দীপের ১০ উইকেটে ভারতের ইতিহাসগড়া জয় ‎

‎‎এজবাস্টনে ১৯তম প্রচেষ্টায় প্রথমবারের মতো টেস্ট ম্যাচ জিতে ইতিহাস গড়লো ভারত। ৬০৮ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ড ৬৮.১ ওভারে ২৭১ রানেই গুটিয়ে যায়। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ভারতের এই জয়টি এসেছে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—প্রত্যেক বিভাগেই স্বাগতিকদের চেয়ে এগিয়ে থাকার মাধ্যমে।


‎‎২৫ বছর বয়সী শুবমান গিল ম্যাচজুড়ে ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রথম ইনিংসে ২৬৯ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬১ রান করে তিনি টেস্ট ক্রিকেটের 'হল অফ ফেম'-এর উপযুক্ত দাবিদার হয়ে ওঠেন। তবে এটি শুধুই ব্যাটসম্যানের ব্যক্তিগত অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকতো, যদি না বোলাররা ২০ উইকেট তুলে নিতে পারতেন। সেখানেও নেতৃত্ব দেন পেসার আকাশ দীপ।

‎‎জাসপ্রিত বুমরাহকে বিশ্রামে রাখার সিদ্ধান্তে অনেকে ভ্রু কুঁচকালেও তার পরিবর্তে আকাশ দীপ দলে ঢুকে নিজের জাত চিনিয়েছেন। ম্যাচে ১০ উইকেট (প্রথম ইনিংসে ৪, দ্বিতীয় ইনিংসে ৬) নিয়ে ম্যাচের সেরা পারফরমার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার সঙ্গে মোহাম্মদ সিরাজও ছিলেন দুর্দান্ত, প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট তুলে নিয়ে ইংল্যান্ডকে ৪০৭ রানে আটকে দেন।

‎গিলের নেতৃত্বে এটি ছিল তার প্রথম টেস্ট জয়, যেখানে তিনি দুই ইনিংস মিলিয়ে ৪৩০ রান করেন এবং শেষ উইকেটটিও ধরেন ফিল্ডিংয়ে। শেষ উইকেটটি আসে আকাশ দীপের স্লোয়ার ডেলিভারিতে, যা গিল তালুবন্দি করেন।

‎বিপরীতে ইংল্যান্ডের দুই ইনিংসে সাতজন ব্যাটসম্যান ‘ডাক’ মারেন। জেমি স্মিথ দুই ইনিংসেই লড়াই করলেও (১৮৪* ও ৮৮), বাকিরা সুবিধা করতে পারেননি। ইংল্যান্ডের চার পেসার মিলেও ৯টির বেশি উইকেট নিতে পারেননি।

‎পঞ্চম দিন সকালে বৃষ্টি দেখে কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন গিল। তিনি আগের দিন ইনিংস ডিক্লেয়ার করতে দেরি করে ফেলেছেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। তবে মাঠকর্মীদের দ্রুত কাজের ফলে দুপুর ১২:৪০-এ খেলা শুরু হয়। ইংল্যান্ড তখন ৭২/৩ স্কোরে ছিল এবং দ্রুতই তারা ১৫৩/৬-এ পরিণত হয়। তখনই নিশ্চিত হয়ে যায়, ভারতের জয় শুধু সময়ের ব্যাপার।

‎ম্যাচশেষে গিল বলেন, “এই ধরনের উইকেটে বোলারদের জন্য উইকেট নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। বল দ্রুত নরম হয়ে যায়। বল যদি কিছু করে, খেলাটাও উপভোগ্য হয়।”

 তবে তিনি মজা করে আরও যোগ করেন, “একজন ব্যাটার হিসেবে আমি এই অবস্থার কিছুটা আনন্দও পাচ্ছি!”

‎নিজের জোড়া সেঞ্চুরি সম্পর্কে গিল বলেন, ‎“মাঝেমধ্যে, বিশেষ করে আপনি যখন অধিনায়ক হন, তখন নিজের উদাহরণ দিয়ে নেতৃত্ব দিতে হয়। যাতে আপনি যখন কাউকে কোনো পরিস্থিতিতে নির্দেশ দেন, সে বুঝতে পারে আপনি নিজেও সেই পথ পেরিয়ে এসেছেন। দল যখন কিছু চায়, তখন ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে পাশে রেখে সেই প্রয়োজনটাই আগে দেখা উচিত। আপনি কিছু ট্রাই করতে চাইতেই পারেন, কিন্তু যদি আপনি দলকে নিজের উপরে রাখেন, তাহলে সঠিক পথে হাঁটবেন বলেই বিশ্বাস করি। এই ম্যাচে আমি সেটাই করার চেষ্টা করেছি। যদি একটা ভালো বল আমাকে আউট করেও দেয়, সমস্যা নেই। কিন্তু যতক্ষণ উইকেটে থাকব, ততক্ষণ টিকে থাকার চেষ্টা করব।”

‎ভারতের ব্যাটিংকে ‘নির্মম’ বলার মতো পারফরম্যান্সের পর গিল মজা করে বলেন, এমন ফ্ল্যাট উইকেট হয়তো ইংল্যান্ড আবার দেবে না। বিশেষ করে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, মাঝখানে ক্লান্তিকর ওভারগুলোতে কি কুলদীপ যাদবের চায়নাম্যান স্পিন মিস করেছেন কিনা।

‎গিল জানান,“একজন মানসম্পন্ন বোলার হিসেবে কুলদীপকে বাদ দেওয়া সহজ ছিল না। তবে আমি অনুভব করেছিলাম, ওয়াশিংটন সুন্দর আমাদের বাড়তি গভীরতা দিতে পারবে, যেটা ও দিয়েছে।”

‎ভারত সাধারণত এত দীর্ঘ টেস্ট ম্যাচ খেলে না। দেশের মাঠে স্পিন সহায়ক উইকেট, আর বিদেশে সবুজ সিমিং পিচ। কিন্তু এই ব্যাক-টু-ব্যাক ম্যাচগুলো প্রায়ই শেষ দিন পর্যন্ত গড়িয়েছে। এ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে গিল বলেন—"এটা আমাদের বিশালভাবে সাহায্য করেছে। ভারতে খেললে বেশিরভাগ টেস্ট পাঁচ দিন যায় না। কিন্তু এখানে বেশিরভাগ সময় আমরা ব্যাটিং করেছি, সেটা আমাদের পক্ষে গেছে। প্রথম ইনিংসেও আমরা মাত্র ৯০ ওভার ফিল্ডিং করেছি, যা এক দিনের সমান। এই অভিজ্ঞতা দারুণ। সিরিজে যদি আমরা ধারাবাহিকভাবে ৩০০ বা ৪০০ রান করতে পারি, তাহলে সব ম্যাচেই আমরা লড়াইয়ে থাকব।”

‎বোলারদের ভূয়সী প্রশংসা করে গিল বলেন, ‎“তারা ছিল অসাধারণ। আকাশ দীপ আর মোহাম্মদ সিরাজ দুজনই মিলে ১৬-১৭ উইকেট নিয়েছে। বুমরাহ ভাইকে ছাড়া খেলতে নেমে অনেকেই সন্দেহ করছিল আমরা ২০ উইকেট নিতে পারব কিনা। কিন্তু ওরা যেভাবে খেলেছে, ভাষা হারিয়ে ফেলি বলার মতো।”

‎ভারতের পেসারদের নিয়ে আত্মবিশ্বাসী গিল যোগ করেন,“এটাই আমাদের দেশের সেরা খেলোয়াড়েরা। আমি বিশ্বাস করি, এই ১৬ জনের যেকোনো বোলিং কম্বিনেশন দিয়েই আমরা বিশ্বের যেকোনো জায়গায় ২০ উইকেট নিতে পারি।”

‎সংক্ষিপ্ত স্কোর

‎ভারত প্রথম ইনিংস: ৫৮৭ (গিল ২৬৯, জাডেজা ৮৯, যশস্বী ৮৭)। ভারত দ্বিতীয় ইনিংস: ৪২৭/৬ ডিক্লেয়ার (গিল ১৬১, জাডেজা ৬৯, পন্ত ৬৫, রাহুল ৫৫)
‎ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংস: প্রথম ইনিংস: ৪০৭ (জেমি স্মিথ ১৮৪*, ব্রুক ১৫৮)। ‎ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংস: ২৭১ (স্মিথ ৮৮)