র‌্যাংকিং ঋতুপর্ণাদের কাছে নিছকই একটা সংখ্যা

বিশ্বের বাঘা বাঘা কোচরা ফিফা প্রকাশিত র‌্যাংকিংকে কখনোই গুরুত্বই দিতে চান না। তাদের কাছে র‌্যাংকিং নিছকই একটা সংখ্যামাত্র। মাঠে এই সংখ্যা যে বড় নিয়ামক হয়ে ওঠে না, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। সদ্য সমাপ্ত নারী এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের ‘সি’ গ্রুপে তার প্রমাণ রেখে সেরা হয়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের এলিট মঞ্চের টিকিট কেটে গোটা ফুটবল বিশ্বকেই তাক লাগিয়ে দিয়েছে তারা।

নারী এশিয়ান কাপের ইতিহাসে ঘটতে চলছে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে তিন অঙ্কের ওপরে থাকা কোনো দল এর আগে কখনো এশিয়ার সর্বোচ্চ আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। অনন্য নজির গড়ে বাংলাদেশের মেয়েরা আগামী মার্চে দাপিয়ে বেড়াবে অস্ট্রেলিয়ার মাঠ। গত জুনে প্রকাশিত র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৮তম। এই র‌্যাংকিংয়ে দাঁড়িয়ে মিয়ানমারের ইয়াংগুনে ঋতুপর্ণারা সোনার হরফে লিখেছেন ইতিহাস। ২০২৬ ওমেন্স এশিয়ান কাপের বাছাইয়ের ‘সি’ গ্রুপে এক ম্যাচ হাতে রেখেই প্রথমবারের মতো পৌঁছে যায় এশিয়ান কাপে। র‌্যাংকিংয়ে ৩৬ ধাপ এগিয়ে থাকা বাহরাইনকে ৭-০ গোলে হারানোর পর ঋতুপর্ণার একক ক্যারিশমায় বাংলাদেশ হারিয়ে দেয় স্বাগতিক মিয়ানমারকে। এর আগে পাঁচবার এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলা মিয়ানমার ছিল সেই ম্যাচের স্পষ্ট ফেভারিট। অথচ ৭৩ ধাপ এগিয়ে থাকা মিয়ানমারকে বাংলাদেশ হারায় ২-১ ব্যবধানে, যা তাদের নিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ায় আগামী বছর হতে যাওয়া এশিয়ান কাপে। এরপর গ্রুপের শেষ ম্যাচে দুর্বল তুর্কমেনিস্তানকে ৭-০ ব্যবধানে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয় বাংলাদেশ। তাতেই বাংলাদেশের মেয়েরা প্রমাণ করে র‌্যাংকিং নিছকই তাদের কাছে সংখ্যামাত্র।

নারী এশিয়ান কাপের শেষ ছয়টি আসরেও অংশগ্রহণকারী চূড়ান্ত হয়েছিল এবারের মতো বাছাইয়ের মাধ্যমে। এএফসি নারী চ্যাম্পিয়নশিপ নামে ১৯৭৫ সালে শুরু হওয়া আসরটিতে এর আগে কখনো বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে তিন অঙ্কে থাকা কোনো দল খেলার সুযোগ পায়নি। ২০০৬ থেকে সর্বেশেষ ২০২২ সালের মোট ছয় আসরে অংশ নেওয়াদের মধ্যে সর্বমিম্ন র‌্যাংকিংধারী ছিল ইন্দোনেশিয়া। ২০২২ সালে ভারতে হওয়া সর্বশেষ আসরে তারা খেলেছিল ৯৪তম স্থানে থেকে। ২০১৮ সালে ফিলিপাইন খেলেছে সর্বনিম্ন ৭২তম স্থানে থেকে। ২০১৪ সালে র‌্যাংকিংয়ে সবার নিচের জর্ডান ছিল ৫৬তম। ২০১০ সালে মিয়ানমার খেলেছে সর্বনিম্ন ৪৪তম স্থানে থেকে। ২০০৮ সালে থাইল্যান্ড ছিল ৩৫তম। আর ২০০৬ সালে মিয়ানমার সুযোগ পায় ৪৪তম স্থানে থেকে। ২০০৩ সালে ১৪ দল সরাসরি খেলার সুযোগ পেয়েছিল। সেবার সর্বনিম্ন র‌্যাংকিংধারী ছিল সিঙ্গাপুর ৮৭তম।

আগামী বছর ১ থেকে ২১ মার্চ ১২ দল নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার তিনটি শহরে হবে এশিয়ান কাপ। এর মধ্যেই ১১ দল চূড়ান্ত হয়েছে। আগের আসরের তিন সেরা চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান এবং আয়োজক অস্ট্রেলিয়ার পর প্রথম দল হিসেবে বাছাই থেকে এলিট তালিকায় নাম লেখায় বাংলাদেশ। এরপর ধীরে ধীরে অন্য গ্রুপগুলোর সেরারা যোগ হয়েছে সেই তালিকায়। বাকি রয়েছে শুধু ‘এ’ গ্রুপের খেলা, যা গতকাল শুরু হয়েছে। ১৯ জুলাই জানা যাবে ইরান, জর্ডান, সিঙ্গাপুর, লেবানন ও ভুটানের মধ্য থেকে কারা যাবে চূড়ান্ত পর্বে।

এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া ১১ দলের সঙ্গে র‌্যাংকিংয়ের ভিত্তিতে তুলনা করলে বাংলাদেশ রয়েছে অনেকটাই পিছিয়ে। র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছে দেশটি ভারত। ‘বি’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে আসা ভারতীয়রাও র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে ৫৮ ধাপ, অর্থাৎ ৭০তম স্থানে। অথচ এই ভারতকে শেষ দুটি সাফের আসরে বলে কয়ে হারিয়েছে বাংলাদেশ। কদিন আগেই জর্ডানে গিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ড্র করে এসেছিল বাংলাদেশ। সেই ইন্দোনেশিয়া আয়োজক হয়েও পায়নি ‘ডি’ গ্রুপ থেকে চূড়ান্ত পর্বের টিকিট। গত মার্চে আরব আমিরাতে গিয়ে দুই ম্যাচে নাস্তানাবুদ হয়েছিল বাংলাদেশ। র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা সেই আমিরাতও আগামী বছর থাকবে মূল আসরের দর্শক হয়ে।

এত কিছুর পর র‌্যাংকিং দিয়ে পিটার বাটলারের বাংলাদেশকে অন্তত বিচার করাটা হবে ভীষণ রকমের ভুল।