নিম্নচাপের প্রভাবে কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতে সাতক্ষীরা পৌরসভার এক তৃতীয়াংশ এলাকা জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। এতে ভোগান্তিতে পৌর এলাকার অন্তত তিন হাজার পরিবার।
সাতক্ষীরার প্রথম শ্রেণীর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারে সকাল ৯টা পর্যন্ত সাতক্ষীরায় মোট ৩৯৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হয়েছে ১০২ মিলিমিটার। এই অবস্থায় সাতক্ষীরার নদী উপকূলে দেয়া হয়েছে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত। আর টানা বৃষ্টির প্রভাব থামতে এখনও তিনদিন লাগবে বলে জানা যায়।
সাতক্ষীরার নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক আজাদ হোসেন বেলাল বলেন, ‘কামালনগর, ইটাগাছা, মেহেদীবাগ, রসুলপুর, বদ্দিপুর কলোনি, রইচপুর, মধ্য কাটিয়া, রথখোলা, রাজারবাগান, গদাইবিল, মাঠপাড়া, পার-মাছখোলা ও পুরাতন সাতক্ষীরার মতো নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা পৌরসভার ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকা। বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে না পারায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’
শহরের কুখরালি এলাকার ইকরামুল হাসান বলেন, ‘প্রভাবশালীরা বিলের মুখ বন্ধ করে মাছের ঘের করছে। তাদের কারণে শত শত পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। প্রায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানের কোন উদ্যোগ নিচ্ছেন না পৌর কর্তৃপক্ষ।’
এইচএসসি পরীক্ষার্থী আফসানা মিমি বলেন, ‘পানির কারণে সময়মতো পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ির শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। জন্মের পর থেকেই এই অবস্থা দেখছি । এই সমস্যা থেকে দ্রুত পরিত্রাণ পেতে চাই।’
বদ্দিপুর কলোনির গৃহবধূ শাহানারা বেগম বলেন, ‘গত ১০ বছর ধরে এমন হচ্ছে, কিন্তু কোনো সমাধান নেই। পোকামাকড় ঘরে ঢোকায় রাতে ঘুমাতে পারছি না। সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় থাকতে হচ্ছে।’
ইটাগাছা বিলপাড়ার বাসিন্দা নাজমুল হাসান বলেন, ‘ঘের মালিকরা বিলে পানি আটকে রেখেছে। বাইপাসের সুইচ গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি খাল দিয়ে নদীতে নামতে পারছে না। ফলে ঘরে-পথে সবখানে পানি। পৌর এলাকার বেশীরভাগ পুকুর এখন ডুবে গেছে। পুকুর থেকে মাছ যেমন বাইরে চলে যাচ্ছে। তেমন পুকুরগুলো নোংরা জলাশয়ে পরিণত হচ্ছে।’
সমাজকর্মী সাজেদুল ইসলাম বলেন, নদী ও খাল খননে অনিয়ম হয়েছে। পাড় উঁচু করে কৃত্রিম গভীরতা দেখানো হয়েছে, তাই বিলের পানি বের হচ্ছে না। বর্ষা হলেই বিলে পানি জমে গ্রামের ঘর বাড়িতে ঢুকছে। বর্ষাকাল এলেই এই সমস্যা দেখা দেয়। পৌরসভার নিম্নাঞ্চলে প্রতি বছর জলাবদ্ধতার বিষয়টি জানা থাকলেও এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না কেউ। ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পৌরবাসীকে।
বিশিষ্ট আইনজীবী ফাহিমুল হক কিসলু বলেন, বছরের পর বছর ধরে সাতক্ষীরার মানুষ একই দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। পৌর মেয়র ও কাউন্সিলররা শুধু নির্বাচনের সময় আসেন। এখন বলেন, সরকার পতনের পর ঠিকাদার পালিয়েছে, তাই কাজ হয়নি। নেটপাটা সরানো, সুইচ গেট সচল রাখা, প্রকৃত গভীরতা অনুযায়ী খাল খনন ও বাঁধ সংস্কার ছাড়া এই দুর্ভোগের সমাধান নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শোয়াইব আহমাদ বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫০ কিলোমিটার খাল ও সেচনালা সংস্কার করা হয়েছে। সুইচ গেট খুলে দেওয়া হবে এবং প্রাণসায়ের খালে পানি ফেলার ব্যবস্থা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে সদরের জলাবদ্ধতা হ্রাস পাবে। আগামীতে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
জলাবদ্ধতায় সাতক্ষীরার সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে হয়েছে অনেক অনেক সভা সেমিনার কর্মশালা। কিন্তু সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের দেখেনি সাতক্ষীরা পৌরবাসী। জলাবদ্ধতার চাপে বিপর্যস্ত সাতক্ষীরাবাসীর এখন জোর দাবি টেকসই ড্রেনেজ পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।