অধ্যাত্মবাদী ঘরানার মানুষদের নিয়ে এমন একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে, তারা কেবলই তুরীয় ভাবের মাঝে আত্মমগ্ন থাকেন। মনে করা হয়, তারা সমাজ ও পরিপার্শ্বের জীবনধারা বিষয়ে উদাসীন। বিষয়টা সে রকম নয়। লালন সাঁইজির অনবদ্য স্বপ্নাকাক্সক্ষাই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ :
এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে।।
শোনায়ে লোভের বুলি
নেবে না কেউ কাঁধের ঝুলি
ইতর আতরাফ বলি
দূরে ঠেলে নাহি দেবে।।
আমির ফকির হয়ে এক ঠাঁই
সবার পাওনা পাবে সবাই
আশরাফ বলিয়া রেহাই
ভবে কেহ নাহি পাবে।।
ধর্ম কুল গোত্র জাতির
তুলবে না গো কেহ জিগির
কেঁদে বলে লালন ফকির
কেবা দেখায়ে দেবে।।
ষোড়শ শতাব্দীর ভারতে ভক্তি আন্দোলনের যে উত্তাল স্রোতধারা বয়ে গিয়েছিল তা ছিল নিম্নবর্গের শোষিত ও অবহেলিত মানুষদের একটা সামাজিক বিদ্রোহও। নানক, কবীর, দাদু, রজ্জব, সুরদাস, রবিদাস, নামদেব প্রমুখের বাণীতে সেসব ভাবাদর্শ উৎকীর্ণ রয়েছে।
এদের মধ্যে রবিদাসের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মার্কস কিংবা ফরাসি বিপ্লবের তিন শতক আগেই তিনি এক সাম্যমূলক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন। বেগমপুরা ছিল তার ইউটোপিয়ার নাম। তার বিখ্যাত একটি ভজন ‘বেগমপুরা’তে তিনি কেবল আত্মমুক্তির কথাই বলেননি, তিনি তুলে ধরেছেন একটি আদর্শ রাষ্ট্রের কল্পনা, যা কোনো প্রকার দুঃখ-কষ্ট, বৈষম্য বা নিপীড়নের স্থান নয়। বেগমপুরা মানে বেদনা-বর্জিত নগর একটি সমাজ যেখানে স্বাধীনতা, সাম্য, মর্যাদা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বিরাজ করে।
রবিদাসের এই আদর্শ নিয়ে পাঞ্জাবি কবি বলবীর মাধোপুরি একটি প্রবন্ধ লেখেন ও সওরভ কাপুর তা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।
বেগমপুরা নির্মাণ
মূল : বলবীর মাধোপুরি
ইংরেজিতে অনুবাদ : সওরভ কাপুর
গুরু রবিদাস এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বাস করবে জাত, বর্ণ, শ্রেণি কিংবা লিঙ্গভেদ থাকবে না। তিনি তার এই আদর্শ সমাজের নাম দেন ‘বেগমপুরা’, একটি বেদনারহিত স্থান।
গুরু গ্রন্থ সাহিবে অন্তর্ভুক্ত, ১৬টি রাগে সুরারোপিত গুরু রবিদাস রচিত ৪০টি কবিতা রয়েছে। তার রচনার অনেকাংশই গুরু গ্রন্থ সাহিবের বাইরে সংরক্ষিত, যেখানে ঈশ্বরের ধারণা ও নির্গুণ দর্শন স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত। তার বাণী অস্পৃশ্যতা, জাতপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর দীর্ঘকাল ধরে নিপীড়িত মানুষের জন্য যুক্তিবাদী চিন্তার উৎস ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রেরণা হয়ে আছে।
তার একটি বিখ্যাত পদ :
‘জাত-পাত কে ফের মহ উরঝে রহে সব লোগ/মনুষ্যতা কু ঘট হ্য রবিদাস, জাত কা রোগ।’ (সবাই জাত-পাতের জালে আটকে আছে/রবিদাস বলেন, মানবতাকে খেয়ে ফেলছে এই জাত নামক ব্যাধি।)
আরও বলেন : ‘রবিদাস এক ব্রহ্ম কা হোয়ে রহ্যো সগল প্রসার/এক মাটি সব ঘট সিরজে, একে সব কো সর্জনহার।’ (রবিদাস বলেন, সমস্ত বিশ^ এক ব্রহ্মের সৃষ্টি/একই মাটি দিয়ে গঠিত সব প্রাণী, এক স্রষ্টাই সবাইকে গড়েছেন।)
এভাবে তিনি তার সমকালীনদের সঙ্গে নিয়ে সৎসঙ্গের মাধ্যমে একটি অধিক সমানতাভিত্তিক সমাজ গঠনের আন্দোলন শুরু করেন। কবীর ও অন্যান্য সন্ত-কবিগণ তার সঙ্গে এই যাত্রায় যুক্ত হন। রবিদাস নিঃশব্দদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন এবং তাহার অনুগামীদের মধ্যে তাঁতের কাজ করা বুননকার, চর্মকার, নাপিত, কসাই, ধোপা প্রমুখ শ্রেণির কারুশিল্পীদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
রবিদাস সহজ-সরল, অলঙ্কারবর্জিত ভাষায় কথা বলতেন, যেটি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যেত। তার পদগুলো হয়ে ওঠে সাম্য ও ন্যায়ের সংগ্রামের হাতিয়ার। যেমন :
‘মন চঙ্গা তো কাথোতি বিচ গঙ্গা।’
(মন পবিত্র হলে, সেই ছোট মাটির পাত্রেও গঙ্গা প্রবাহিত হয়।) তিনি বহু ধর্মবিশিষ্ট ভারতে বার্তা পৌঁছে দিয়ে মানুষকে বোঝান রাম ও রহিম, কৃষ্ণ ও করিম, সবই এক। তার মতবাদ ছিল হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতি স্পষ্ট আহ্বান।
‘মন্দির মসজিদ দু-এক হ্যায়, এহ মা অন্তর নাহি/রবিদাস রাম-রেহমান কা ঝগড়া কোই নাহি।’ (মন্দির ও মসজিদ এক; এর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। রবিদাস বলেন, রাম ও রহমানের মধ্যে কোনো বিবাদ নেই।)
ছয় শতাব্দী আগে গুরু রবিদাসের হৃদয়ে বাস করত এমন এক পবিত্র আকাক্সক্ষা একটি সমাজ গড়ার, যেখানে কেউই জাত, লিঙ্গ, আর্থ-সামাজিক অবস্থানের কারণে বৈষম্যের শিকার হবে না; যেখানে মানুষকে কোনো কর দিতে হবে না এবং তারা স্বাধীনভাবে স্থানান্তর করতে পারবে। এই সমাজের নাম তিনি দেন ‘বেগমপুরা’, বেদনারহিত শহর।
গুরু গ্রন্থ সাহিবে একটি শব্দে এর বিস্তারিত বিবরণ আছে :
‘তারা তাকে বেগমপুরা বলে, এক বেদনারহিত স্থান/কর নেই, চিন্তা নেই, সম্পত্তির দখল নেই/নেই অন্যায়, ভীতি, নির্যাতন/ওহে ভাই, আমি একে নিজের ঘর করে নিয়েছি/আমার দূরের দেশ, যেখানে সব কিছু সঠিক/সেই রাজকীয় রাজ্য সমৃদ্ধ ও নিরাপদ/সেখানে কেউ তৃতীয় বা দ্বিতীয় নয় সবাই এক/সেখানে খাদ্য ও পানীয় বিখ্যাত, বাসিন্দারা তৃপ্ত ও সমৃদ্ধ/তারা যা ইচ্ছা তা করে, যেখানে খুশি সেখানে চলে/
পরিচিত স্থানে ঘুরে বেড়ায় বাধাহীন/ওহে, বলে রবিদাস, এক চর্মকার আজ মুক্ত /
যারা আমার সঙ্গে পথ চলে, তারাই আমার বন্ধু।’
গুরু রবিদাস হস্তশিল্প ও পরিশ্রমে বিশ্বাস করতেন এবং তার কবিতায় নিজের চর্মকার পরিচয় গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তার কবিতাগুলো গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রকাশ।
এক পদে বলেন :
‘আইসা চাহুঁ রাজ ম্যায়, জাহাঁ মিল্য সবহন কো অন্ন/ছোটে-বড়ে সব সম বস্যায়, রবিদাস রহ্যো পরসান।’ (আমি এমন এক রাজত্ব চাই, যেখানে সবাই খাদ্য পায়/ছোট-বড় সবাই সমভাবে বসবাস করে রবিদাস তাতে খুশি।)
এই দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক শিখ পণ্ডিত গুরু গ্রন্থ সাহিবে অন্তর্ভুক্ত ভগত বাণীকে এক ধরনের দলিত পাঠ বলে থাকেন। তাদের মতে, গুরু নানকদেব পুরো ভক্তি আন্দোলনকে এক গণজাগরণে পরিণত করেন। শিখ পণ্ডিত যশোবন্ত সিং জাফর তার গ্রন্থ ‘ভগত সত্যগুরু হামারা’তে বলেছেন, গুরু অর্জুনদেব, যিনি গুরু গ্রন্থ সাহিব সংকলন করেন, রবিদাস বাণীকে এক অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে গ্রহণ করেন। গুরু রামদাসও তার বাণীতে রবিদাসের প্রশংসা করেছেন, যেগুলো গুরু গ্রন্থ সাহিবের ১২০৭ ও ৮৩৫ নম্বর পাতায় সংরক্ষিত।
তবে এটাও খেয়াল করা জরুরি যে, রবিদাস সম্প্রদায় কীভাবে এই বিপ্লবী সন্তকে পুনরাবিষ্কার করল এবং নিজেদের সামাজিক পুনরুত্থানের পথ রচনা করল। এর সূচনা ১৯২৬ সালের ১১ বা ১২ জুনে, যখন গদর পার্টির বিপ্লবী মাঙ্গু রাম পাঞ্জাবের হোশিয়ারপুর জেলার মু¹োয়াল গ্রামে ‘আদি ধরম মন্ডল’ প্রতিষ্ঠা করেন। একটি পূর্ণ সমাবেশে রবিদাস, কবীর, নামদেব ও ঋষি বাল্মীকিকে ‘আদি গুরু’ ঘোষণা করা হয়। তার নেতৃত্বে ১৯৩৪ সালে বারাণসি থেকে গুরু রবিদাসের একটি ছবি আনা হয় এবং তা ৩৬টি নিম্নবর্ণের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
সেই সময় যারা অস্পৃশ্য (বর্তমানে তফসিলভুক্ত জাতি) হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাদের কাছে এটি ছিল এক নতুন জীবন লাভের অনুভূতি। অবিভক্ত পাঞ্জাবে, এমনকি দেশভাগের পরেও, অনেক মন্দির ও গুরুদ্বারে এসব জাতির প্রবেশাধিকার ছিল না। ফলে আদি ধর্মীরা নিজেদের উপাসনাস্থল প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে, পাঞ্জাবের ১২,৫০০টি গ্রামে দলিতদের ১০,০০০-এরও বেশি মন্দির বা গুরুদ্বার রয়েছে। হিমাচল প্রদেশে এদের বলা হয় ‘আদি দ্বারা’, যেখানে পূজার জন্য ‘আদি প্রকাশ গ্রন্থ’ (১২৪৮ পৃষ্ঠা বিশিষ্ট) রাখা হয়।
রবিদাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু ঐতিহাসিক স্থান চিহ্নিত করে সেখানে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে গুরু রবিদাস জন্মস্থান মন্দির, বারাণসির নিকটবর্তী কাশীতে অবস্থিত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। ধারণা করা হয়, ১৪শ শতকে তিনি এখানেই জন্মগ্রহণ করেন।
গুরু রবিদাসের সামাজিক চেতনা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রতিফলিত হয় এই পঙ্্ক্তিতে :
‘মাটির কা পুত্র ক্যায়সে নাচতা হ্যায়/দেখ্যে, শুনে, বলে, দৌড়ে ফিরে বেড়ায়।’ (মাটির পুতুল কেমন নাচে/দেখে, শোনে, কথা বলে, দৌড়ে বেড়ায়।)
এই পঙ্্ক্তিটি বহুমাত্রিক অর্থবহন করে। এটি একদিকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সতর্ক করে, তেমনি অন্যদিকে ভালো কাজের প্রেরণাও জোগায়। আরেকটি শব্দে তিনি বলেন :
‘সৎসঙ্গ তি মিল রহিয়ে মাধো, যেমন মধুপ মাখিরা।’ (মাধব, সদা সৎসঙ্গ করো, যেমন মৌমাছিরা একত্রে থাকে।)
এরূপে তিনি দলিত সমাজকে মৌমাছির মতো একত্রে থাকার পরামর্শ দেন যদি কেউ তোমার দিকে আঙুল তোলে, তবে সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়াও।
(ইংরেজি রচনা প্রথম প্রকাশ : ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বঙ্গানুবাদ ১৮ জুন ২০২৫) ।