বিভিন্ন সংস্কারে বিদেশি শর্ত এবং পরামর্শ

আইএমএফ থেকে ফান্ড প্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় নেগোশিয়েশন করছে বাংলাদেশ। আইএমএফ এ ধরনের বিশেষ ফান্ড প্রাপ্তির জন্য সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিতে সংস্কারধর্মী কঠিন শর্ত আরোপ করে। অনেকে মনে করেন, এত কঠিন শর্ত মেনে ফান্ড পাওয়া মানে নিজের অনেক বিপদ ডেকে আনা। অন্যভাবে বললে, শর্ত পরিপালনে সংস্কারের কাজ সুখকর হয় না। কিন্তু এখানে বিশেষভাবে বিবেচ্য থেকে যাবে, কেন এই শর্ত আরোপ? সেই শর্ত বিদ্যমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় পরিলক্ষিত দুর্বলতা, দুরবস্থা, সমস্যা-সংকট থেকে অর্থনীতিকে উদ্ধার, অদক্ষ ও অপারগতাকে পারঙ্গম করে তোলা এবং অনিয়ম দূর করার জন্য। কেউ স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজেকে সুস্থ সবল রাখতে পারলে, তার জন্য ডাক্তারি প্রেসক্রিপশনের প্রয়োজন হয় না। তেমনি কোনো দেশ বা অর্থনীতি নিজেদের ব্যবস্থাপনায় দক্ষ বা পারঙ্গম না হলে, সুশাসন বর্জিত হয়ে, জবাবদিহিহীন পরিবেশে দুর্নীতিগ্রস্ত, নিজেদের ভুল পদক্ষেপ, অন্যায়-অনিয়মের কারণে অর্থনীতিকে যখন দুর্বল করে ফেলা হয়, তখন তাকে উদ্ধারের জন্য সংস্কারের প্রেসক্রিপশন আসবেই। সুতরাং আইএমএফের সংস্কারের শর্ত মানতে হিমশিম খাওয়া মানে, স্বীয় পাপের প্রায়শ্চিত্তে নামা। সতর্ক থাকলে, নিয়মানুযায়ী চললে সাধারণত ডাক্তার ডাকার প্রয়োজন পড়ে না।

ব্যবসাবাণিজ্য ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই বিদ্যমান মূল্য সংযাজন কর (মুসক) আইন সংস্কার করে নতুনভাবে প্রণয়ন ও প্রবর্তনে আপত্তি জানিয়েছিল ২০১২ সালে এবং তারপরও, ২০১২ সালের আইন ২০১৯-এর আগে আকিকা হয়নি। এখনো ভ্যাট আইনটির প্রয়োগ ও প্রবর্তন রক্তমাংসে মোটাতাজা হয়নি। ১৯৯১ সালের মূসক আইনটি সময়ের অবসরে। দেশের ব্যবসাবাণিজ্য আর্থিক কর্মকা-ের ব্যাপক বিস্তারের প্রেক্ষাপটে বাস্তবায়ন যোগ্যতার আলোকে সংস্কারের যৌক্তিকতা ও দাবি ছিল অনেক দিনের। ২০০৫ সাল থেকে আইএমএফ আইনটির সংস্কারের তাগিদ দিচ্ছিল। বাংলাদেশ তখন সে কথা কানে তুলতে বিলম্ব করে। ফলে ২০১০ সালে আইএমএফ ইসিএফ সুবিধা দেওয়ার সময় ভ্যাট আইন পরিবর্তনের কঠিন শর্ত দেয়। ইসিএফের ২০১২ সালের কিস্তি ছাড়ের অন্যতম ট্রিগার বা শর্ত ছিল, নতুন ভ্যাট আইন প্রবর্তন করতে হবে। ফলে আইনটির খুঁটিনাটি দিক পর্যালোচনা এবং সবার মতামতের ভিত্তিতে পরিবর্ধন-পরিমার্জন করে যথাসময়ে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে আইন প্রণয়নের পন্থা অবলম্বন না করেই আইন প্রবর্তনে বাধ্য হয় বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে তা গলধকরণের ফলে কার্যকর প্রবর্তনে বেশ বেগ পেতে হয়েছে বা হচ্ছে।

এটি প্রণিধানযোগ্য যে, দাতা সংস্থার শর্ত ও বিদেশি পরামর্শকের মুসাবিদায় আইন তৈরি হওয়ায় আইনের চেহারা-চরিত্র ও ভাবদর্শন নিয়ে মতান্তর ঘটে। সোজা কথায়, বালসুলভ এ প্রশ্ন উঠছে যে, ‘হাঁটব আমি বাংলাদেশের রাস্তায়, মাথায় কেন ব্রিটিশ ট্রাফিক আইন?’। বিদেশি পরামর্শে দেশি উদ্যোগের বাস্তবায়ন যে বাস্তবতার আশপাশে ঘোরাফেরা করতে পারে না, এটা বোঝার তাগাদা আসে বারবার। ১৯৯১ সালে ভূতপূর্ব ‘বিক্রয় কর’-এর স্থলে এবং অনেক দেশে প্রচলিত ‘গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স’ (জিএসটি)-এর আদলে ‘ভ্যালু অ্যাডেড ট্রাক্স’ (ভ্যাট) ওরফে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) প্রবর্তিত হয়েছিল। সে সময় নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম বছরেই এই আইন প্রবর্তনের সময় বেশ বিতর্ক, অনিচ্ছা, অনীহা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিসরে দেখা গেল, আইনটি টিকে গেছে। পাশের দেশে বাংলাদেশের ভ্যাট আইনের প্রশংসা মিলেছিল। তবে সবসময় যা হয়ে থাকে, বাস্তবায়ন পর্যায়ে এর অনেক ধারা পরিবর্তন-পরিমার্জনের মধ্যে পড়ে। প্রতি বছরের ‘অর্থ বিল’-এ তা প্রস্তাব করা হয়েছে, গৃহীত হয়ে আসছে। মূসক আইন সংস্কারের বিদেশি পরামর্শ ও শর্ত অনেক দিনের। এ জাতীয় কাজে বিদেশি পরামর্শকের কর্মসংস্থান হয় ভালো। ২০০৭-০৮ সালে সেই পরামর্শ ও দাবির মোকাবিলায় বলা হয়েছিল, দেশীয় আইনের মাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতি ও বাস্তবতার আলোকে দেশীয়ভাবে নিয়মিত সংস্কার করা হবে। বিদেশি পরামর্শকের মুসাবিদায় দেশীয় আইনের চরিত্র অনেক পাল্টিয়ে যায়। কেননা, বিভিন্ন উন্নত অর্থনীতির ‘বেস্ট প্র্যাকটিস’গুলো ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’ করে প্রণীত গুরুপাক আইন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে হজমযোগ্য হয় না বলেই তা বাস্তবায়নে নানান দুর্বিপাক সৃষ্টি হয়, উদ্ভব হয় নানা সমস্যা। এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বহু আইন তৈরি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘটেছে। বিদেশি পরামর্শ ও শর্তে বাংলাদেশে বহু প্রতিষ্ঠান ভাঙা-গড়া হয়েছে। আবার বানানো ভবন ভেঙে পূর্বের অবস্থায় ফেরত যেতে হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সংসার ভেঙে খান খান হয়েছে অনেকবার। দেশি-বিদেশি শিল্পোদ্যোগ নিয়ন্ত্রণের নামে এন্তার পোশাক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ইকোনমিক জোন বংশে নতুন প্রজন্মের ছড়াছড়ি। আইনের উদ্দেশ্য বিধেয়র মধ্যে বাস্তবায়ন যোগ্যতার প্রশ্নে অস্পষ্টতা, অন্তর্দ্বন্দ্ব, দ্বিধা ও সাংগঠনিক সমস্যা বারবার উঠে আসায় তা প্রণয়ন ও প্রবর্তন প্রলম্বিত হয়েছে। বিদেশি পরামর্শ ও শর্ত মানতে গিয়ে শুধু নতুন আইন তৈরি আর সংস্থা নির্মাণ করার যৌক্তিকতা সেই নিরীখে ভেবে দেখা দরকার। রাজস্ব আইন সংস্কারের এ আয়োজন এবং উদ্যোগ সহসা সচকিত নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলছে পরিকল্পনা আর প্রাজ্ঞ পরামর্শকদের প্রয়াস পারঙ্গমতা। আইন সংস্কারের সব উদ্যোগের আগ্রহ অভিপ্রায়ে কোনো কমতি নেই, কিন্তু বিদ্যমান আইনে ‘শতেক শতাব্দী ধরে নামা শিরে অসম্মান ভারের’ লাঘব প্রকৃত প্রস্তাবে ঘটছে কি না, সংস্কারকৃত আইন কতটা বাস্তবায়ন সম্মত, রাজস্ব আহরণকারী এবং দাতার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে প্রয়োজনীয়তা কতটুকু এবং তার রূপকল্প ও তাৎপর্য বিশ্লেষণের আবশ্যকতা থেকে যাচ্ছে।

আমরা জানি যে, চিন্তা থেকে যেমন কাজের উৎপত্তি, আইনের প্রয়োগ তেমনি আইনের দৃষ্টিভঙ্গি ভেদে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। যারা আইন তৈরি করেন, তাদের সঙ্গে যাদের ওপর এটির প্রয়োগ হবে তাদের মধ্যকার সম্পর্কেরও একটা বিশেষ ভূমিকা আছে আইনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে। এখানে তৃতীয় আরেক শরীকের কথাও এসে যায়। যাদের মাধ্যমে আইনটির প্রয়োগ হবে, তাদের মনোভাব, মনোভঙ্গি সক্ষমতা-অক্ষমতার ব্যাপারটিও বিশেষভাবে বিবেচ্য থেকে যায় আইনের প্রয়োগ তথা বাস্তবায়ন যোগ্যতার ক্ষেত্রে। কেননা আইন প্রয়োগের দায়িত্ব আইন প্রণেতার নয়, নির্বাহী বিভাগের। আইন পরিষদ যদি মনে করে এ আইন অন্যের জন্য, পরিষদ সদস্যদের ওপর সবসময় বা সমভাবে বর্তাবে না এবং নির্বাহী বিভাগও যদি ভাবে, এ আইন নিজের ওপর ততটা নয়, যতটা অন্যের ওপর প্রয়োগের জন্যই, তাহলে যাদের ওপর আইনের প্রয়োগ তারা হয়ে পড়েন প্রতিপক্ষ আইন প্রণেতা ও প্রয়োগকারীর। এই প্রতিপক্ষতার পরিবেশেই আইনের দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে যায় নিবর্তনমূলক, প্রতিরোধাত্মক। এই প্রেক্ষাপটে আইন উপেক্ষার, অমান্যের ও অগ্রাহ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজস্ব আইনগুলোর সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি হলে দেখা যাবে, এ আইন জন্মগতভাবে ব্রিটিশ, দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে ঔপনিবেশিক এবং প্রয়োগিক দিক থেকে কিছুটা জটিল, নিবর্তনমূলক ও প্রতিরোধাত্মক। এদেশে ভূমি কর বা রাজস্ব আদায় এর প্রথা প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে চলে এলেও, আধুনিক কর আইনগুলো প্রবর্তিত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে। প্রথম থেকেই আদায়ের ক্ষেত্রে করদাতাদের প্রতি বশংবদ অদায়িত্বশীল আচরণ, পারস্পরিক অবিশ্বাস, ফাঁকিজুকি প্রতিরোধাত্মক ঔপনিবেশিক মনোভাব প্রাধান্য পায়। সব পর্যায়ে পরিপালনীয় বিধিবিধানের ভাষা জটিল ও দ্ব্যর্থবোধক হয়ে ওঠে।

‘তোমার আয় হোক আর না হোক অর্থাৎ বাঁচ-মরো রাজস্ব আমার চাই’ এ ধরনের আইনগত দৃষ্টিভঙ্গির বদৌলতে কর আদায়কারী বিভাগের সঙ্গে করদাতাদের সম্পর্ক জবরদিস্তমূলক, পরস্পরকে এড়িয়ে চলার কৌশলাভিমুখী হয়ে পড়ে। অবিশ্বাস ও প্রতিদ্বন্দ্বী পরিবেশে কর নির্ধারণ ও পরিশোধের ক্ষেত্রে পরস্পরকে এড়িয়ে চলার ফলে অনৈতিক আঁতাতের মাধ্যম রাজস্ব ফাঁকি সংস্কৃৃতির সূত্রপাত ঘটে। দুর্নীতির পরিবেশ সৃষ্টির নেপথ্যে, আইনের মধ্যেই যেন রয়ে যায় পরোক্ষ প্রেরণা বা সুযোগ। এমন অনেক আইন আছে, যা প্রয়োগ পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে বেআইনি আচরণকে উসকে দেয়। এ দেশের রাজস্ব নীতি ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আইন হবে এ দেশেরই আবহমান অর্থনীতির আবহে লালিত ধ্যান-ধারণার প্রতিফলক। হবে সহজবোধ্য, জটিলতা পরিহারী এবং এর প্রয়োগ হবে স্বাচ্ছন্দ্যে যা সর্বজনীন ব্যবহারের উপযোগী। তবেই বাড়বে এর গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন যোগ্যতা। অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থানরত করদাতাগণ যেন অভিন্ন আচরণে আইনগতভাবে কর প্রদানে দায়িত্বশীল হতে স্বত্বঃস্ফূর্ততা বোধ করেন। কর ‘আদায়’ নয়, কর আহরণে করদাতা ও কর আহরণকারীর মধ্যকার দূরত্ব যত কমে আসবে, যত অধিক মাত্রায় করদাতা কর নেটের আওতায় আসবেন, তত কর রাজস্ব আহরণে সুষম, সহনশীল ও দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটবে। এরূপ পরিস্থিতিতে করদাতাকে তাড়া করে ফেরার মতো স্পর্শকাতরতার অবসান ঘটবে।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

mazid.muhammad@gmail.com