একসময় দুর্নীতি দমন কমিশনকে সরকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বর্তমানে কমিশন প্রমাণের ভিত্তিতে, আইনের আলোকে কাজ করছে। গত এক বছরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে চারশোর অধিক মামলা হয়েছে। যার মধ্যে শেখ হাসিনা, তার পরিবার, প্রাক্তন মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সেনা ও পুলিশ সদস্য রয়েছেন। ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘ সময় ধরে দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্তদের তালিকায় সরকারি কর্মকর্তারা থাকেন শীর্ষে। এরপর বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধি। যদিও সরকারি কর্মকর্তারা অতীতের চেয়ে বর্তমানে অনেক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। তারপরও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জিহ্বা লোভের লালায় ভিজে যায়। যে কারণে জনগণের সম্পদ লুটেপুটে খেতে তাদের কোনো দ্বিধা হয় না। এসব দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিরা আবার থাকেন, সরকারের ক্ষমতাধর ব্যক্তির আশপাশে। আসলে সমাজে দুর্নীতি ব্যাধির আকার ধারণ করেছে। অতীতে সরকারি কর্মকর্তা অবসর বা পিআরএলে গেলে যেসব সুবিধা পেতেন, সেসব সুবিধা অনেকগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। চাকরি শেষে পেনশন এখন সহজভাবে পাওয়া যায়। বেতন ভাতা, পেনশন ডিজিটাল পদ্ধতিতে ইএফটির মাধ্যমে প্রদান করা হয়। ফলে বিভিন্ন অফিসে বছরের পর বছর দৌড়াতে হয় না। তবু দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের লোভ কমে না। এ এক অদ্ভুত মনোবিকার।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার (রিপন মিয়া) বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, বদলি বাণিজ্য, সড়ক ও জনপথের সরকারি ফ্ল্যাট গ্রহণ, এতিমখানার নামে অর্থ উত্তোলন, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ অনিয়ম-দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সাবেক মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, তার স্ত্রী আফরোজা খান ও ছেলের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের রেকর্ডপত্র সাত কর্মদিবসের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে। গত পরশু এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রেকর্ডপত্র দুদকে এসে পৌঁছায়নি। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলায় আসামির তালিকায় নাম রয়েছে তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার। ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। গত বছরের ৭ আগস্ট মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।
জানা গেছে, দুদকের গোয়েন্দা ইউনিটের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ফলে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি পিরোজপুর জেলার ভা-ারিয়ায় তার পৈতৃক মিয়াবাড়িতে একটি চারতলা ভবন নির্মাণ করেছেন এবং এলাকায় অনেক জমির মালিকানা অর্জন করেছেন। এ ছাড়া ঢাকার কল্যাণপুরের ১১ নম্বর রোডে ৫৭/১ নম্বর প্লটে তার একটি বাড়ি রয়েছে। আবার ‘প্রত্যাশা ভবন’ নামের একটি বাড়ি তিনি শ^শুরের নামে করে দিয়েছেন। উত্তরার দিয়াবাড়ীতে সওজ-এর জায়গায় তার একটি প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া পূর্বাচল এবং বিসিএস অ্যাডমিন হাউজিং সোসাইটিতে তার নামে প্লট আছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভা-ারিয়ার চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম মিরাজ তাকে দুবাইয়ে একটি ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায়ও তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পত্তি রয়েছে। তিনি নিজের বাবার নামে একটি অস্তিত্বহীন এতিমখানার সরকারি অর্থ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্নীতির পরও শাস্তি না পাওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা বেড়েছে। তারা দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পরামর্শ দিচ্ছেন। অনেকের ধারণা, দুর্নীতি এখন সমাজের প্রতি ক্ষেত্রে শুধু বিস্তৃত হয়নি, স্বরূপও বদলে গিয়েছে। একসময় উচ্চস্তরের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সব সরকারি ক্রয় ও কন্ট্রাক্টের একটি অংশ উৎকোচ হিসেবে নিতেন। সে ঐতিহ্য বিগত সরকারের সময়ও ছিল। বর্তমানে কী অবস্থা, তা জানা নেই। একজন তোফাজ্জল হোসেনের যদি এই পরিমাণ সম্পত্তি থাকে, তাহলে সমস্ত দুর্নীতিবাজের মোট কেমন অঢেল অর্থ থাকতে পারে? অথচ এই প্রবণতা বন্ধে কোনো সুকঠিন, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেই। যে কারণে, সময় এসেছে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আরও কঠিন এবং নির্মম শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করার। না হলে দুর্নীতি ব্যাধির চিকিৎসা অসম্ভব।