রাষ্ট্রসংস্কার উদ্যোগ কি প্রশ্নের মুখে?

দ্বিতীয় দফায় দলগুলো বারবার আলোচনায় বসছে। কিন্তু তারা মিনিমাম কোনো ন্যাশনাল  কন্সেন্সাসে আসতে ব্যর্থ হচ্ছে। এটা হওয়াই স্বাভাবিক। রাজনীতিবিদদের মনের কথা, শুধু মুখের কথা থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই। কেননা তারা রাজনীতিবিদ। পুলিশ ও প্রশাসনের নাকে দড়ি দেওয়ার সক্ষমতা তাদের আছে। বিচারকের রায় বদলানোর ক্ষমতা তাদের আছে। রাজনীতি তাদের নেশা ও পেশা। আশার কথা হলো, এখন পর্যন্ত তারা আলোচনায় শুধু তাদের মুখটা ব্যবহার করছে। যদিও এ নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেকে সন্দিহান।

রাজনীতিবিদদের মনের কথা বডি ল্যাংগুয়েজ থেকে সবটা নয়, কিছুটা আঁচ করা যায়। সরকার ও ন্যাশনাল কন্সেন্সাস কমিশন মিনিমাম ন্যাশনাল কন্সেন্সাস বিনির্মাণে অত্যন্ত আন্তরিক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যদিও রাষ্ট্রসংস্কার বানচাল করার জন্য স্বার্থান্বেষী মহল তাদের আমেরিকার দালাল বলে প্রচুর মিথ্যা  প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে কমিশনের চরিত্র হনন করছে। বহু আমজনতা দেশ-বিদেশের এসব অবিরাম অপতথ্য প্রবাহ বা মিথ্যাচার থেকে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হচ্ছে। এর কারণ, স্বার্থান্বেষী মহলের পুঁজি দিয়ে মিডিয়া চলে। সরকার এক্ষেত্রে সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করে, ব্যক্তিমালিকানা থেকে মিডিয়াকে মুক্ত করতে পারত। সরকারপ্রধান নিজে সামাজিক ব্যবসা তহবিলের উদ্ভাবক হয়েও কেন তথ্য, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা খাতে পরীক্ষামূলকভাবে হলেও দুয়েকটা প্রকল্প হাতে নিতে পারলেন না? এ প্রশ্নটি এখন অনেক মানুষের। একই প্রশ্ন প্রযোজ্য তার ‘তিন শূন্য’ মতবাদের ক্ষেত্রে। শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য শ্রম মন্ত্রণালয়ে অন্তত একটি অধিদপ্তর তো তিনি অনায়াসে খুলতে পারতেন। সরকার কী করে ভাবল যে, স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের ক্ষতি করে সরকারকে অনায়াসে রাষ্ট্রসংস্কার করতে  দেবে? 

রাষ্ট্রসংস্কারের অ্যাডভোকেসির ব্যাপারে কমিশনকে উদাসীন মনে হচ্ছে। রাষ্ট্রসংস্কারের অনুকূলে জনমত সৃষ্টি না হলে, এসব কন্সেন্সাস রাজনীতিবিদরা দিন শেষে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আগের দিনে ফিরে যাবে। অথচ কমিশনের দিক থেকে জনমত সৃষ্টির ব্যাপক কোনো কর্মপরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। শুধুমাত্র দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করলে তা হবে অদলীয় রাষ্ট্রশক্তিগুলোকে উপেক্ষা করার শামিল এবং দেশকে আবার দলসর্বস্ব রাজনীতির দিকে ঠেলে দেওয়া যেখানে দলের ভেতরে গণতন্ত্র অনুশীলন ও  চর্চায় প্রচুর ঘাটতি বিদ্যমান। অদলীয় রাজনীতিকে মাইনাস করে ওয়েস্ট মিনস্টার গণতন্ত্র অচল। অদলীয় রাজনীতি মানে পেশাজীবীদের ন্যায্য পেশাগত দাবি-দাওয়া আদায়ের রাজনীতি যা কেবলমাত্র নিশ্চিত করা যায় উচ্চকক্ষে জ্ঞানভিত্তিক পেশাজীবীদের নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের সুযোগ দানের মাধ্যমে। অর্থাৎ সামরিক ও অসামরিক আমলাতন্ত্র, শিক্ষক, ছাত্র, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। অথচ কমিশন এখনো তাদের আলোচনার জন্য ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে ডাকেনি। রাষ্ট্রসংস্কারের পক্ষে ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, আমলা, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরা রাজপথে মানববন্ধন ও মিছিল না করলে রাষ্ট্রসংস্কার ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণি রাষ্ট্রসংস্কারের নিউক্লিয়াস। উচ্চকক্ষে তাদের এবং ছোট ছোট দলগুলোকে পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষে এনে নীতিনির্ধারণের সুযোগ না দিলে, পণ্ড হবে সবকিছু।

যদি কন্সেন্সাস না হয়, তাহলে কমিশন কোন পথে হাঁটবে তার গভীর কোনো হোমওয়ার্ক তাদের আছে কি না, তা জানা নেই। হয়তো আছে অথবা নেই। রাষ্ট্রসংস্কারে অ্যাডভোকেসি করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে সরকার গত এক বছরেও সম্পৃক্ত করতে পারেনি। রাষ্ট্রসংস্কারে দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা চরম নির্লিপ্ত কেন? রাষ্ট্রসংস্কারে কি তাদের পেশাগত স্বার্থ সংরক্ষণের কোনো বন্দোবস্ত নেই? তাহলে তারা রাষ্ট্রসংস্কার-বিরোধী হয় কীভাবে? জেলায়-উপজেলায় এত প্রেস ক্লাব কেন? পেশাজীবী সংগঠনগুলো এত বিভক্ত কেন? উচ্চকক্ষে পেশাজীবীদের নিজস্ব পেশা স্বার্থ নিয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলার স্পেস বা সুযোগ করে না দিলে তো, কতিপয় ধান্দাবাজ পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে তাদের ব্যক্তিগত কুমতলব হাসিল করবেই। ফ্যাসিবাদ প্রত্যেকটি মানুষের মনস্তত্ত্বে সুপ্ত থাকে। কেবলমাত্র সাংবিধানিক সুযোগ পেলে তা বিকশিত হয়। সুযোগ না থাকলে তা বিকশিত হওয়ার কথা নয়। যথার্থ রাষ্ট্রসংস্কার করতে হলে কমিশনকে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তা না হলে জুলাই সনদ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। 

রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোতে তিনটি পদের ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা রাষ্ট্রসংস্কারের  প্রথম কাজ। এক. যারা ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য বানায়, তাদের ভোট প্রত্যাহার করে এমপিকে অপসারণ করার সহজাত ও সাংবিধানিক ক্ষমতা ন্যস্ত করতে হবে। কেননা ভোটাররা ভোট দিয়ে রাষ্ট্রের মালিকানা স্বত্ব ৫ বছরের জন্য একজন এমপিকে অর্পণ করে না। কাজেই ভোট নাগরিকদের ফেরতযোগ্য অধিকার। এটা করা হলে, এমপিকে ঘোড়ার মতো কিনে কোনো অপশক্তি জনপ্রিয় সরকারকে ফেলতে পারবে না। দুই. প্রধানমন্ত্রী সংসদের কাছে জবাবদিহি করবেন। সংসদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করবে না এবং এটা নিশ্চিত হবে সত্তর অনুচ্ছেদে এমপিদের অনাস্থা ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক ও সহজাত ক্ষমতা অনুশীলনের সুযোগ দিয়ে। তিন. ফ্রান্সের মতো জনগণের সরাসরি ভোটে অদলীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে, রাষ্ট্রপতিকে মেধা ও যোগ্যতা যাচাই শেষে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে  নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা দরকার। দেশের সব নাগরিককে মনে রাখতে হবে, বিগত ১৫ বছরে সবসময় সংবিধানের দোহাই দিয়ে ফ্যাসিবাদ টিকে ছিল। সংসদে সংবিধান সংশোধনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের ছিল। জনস্বার্থে তা তারা করতে পারত, কিন্তু করেনি। বাস্তবতা হচ্ছে, ক্ষমতা একবার হাতে পেলে, কেউ তা করে না।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

mukulhakim85@gmail.com