বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের দরপতন অর্থনীতিতে সাময়িক স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে আসা ডলারের দাম এখন ১২০ টাকার নিচে। এই পতনের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন—যার মধ্যে প্রবাসী আয়, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রিত থাকাই বড় কারণ।
গত বছরের ডিসেম্বরেই যেখানে ডলারের দাম রেকর্ড গড়েছিল, এখন সেটি ধাপে ধাপে কমে এসেছে। একসময় যেখানে প্রতি ডলার লেনদেন হয়েছে ১২৮ টাকায়, এখন তা নেমে এসেছে ১১৯ টাকায়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ ও রপ্তানি আয়ের বৃদ্ধিই মূল চালিকাশক্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থসহায়তা এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণ।
২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ৪ হাজার ৮৭ কোটি ডলার, যেখানে আমদানি হয়েছে ৬ হাজার ২৫ কোটি ডলারের পণ্য। এতে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে ৪.১৭ শতাংশ।
এই প্রবণতা থেকে বোঝা যাচ্ছে, দেশের বৈদেশিক খাত এখন আগের তুলনায় বেশি স্থিতিশীল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেমিট্যান্স ও রপ্তানির যৌথ প্রবাহ টাকার মানকে শক্তিশালী করছে এবং মূল্যস্ফীতিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনছে।
রিজার্ভের দিক থেকেও বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছর শেষে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার—গত দুই বছরের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। এর মধ্যে আইএমএফ, এডিবি, জাইকা এবং এআইআইবির কাছ থেকে আসা অর্থ এই রিজার্ভ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
চলতি বছরের ১৫ মে থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিনিময় মূল্য নির্ধারণে নমনীয় বাজারভিত্তিক পদ্ধতি চালু করেছে। এতে ব্যাংক ও গ্রাহক নিজেরাই দর নির্ধারণ করছে। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন এতে হয়তো ডলারের দাম আরও বেড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে উল্টো—দাম কমেছে, এবং বাজারে ভারসাম্য এসেছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিচ্ছেন—এই প্রবণতা স্বস্তিদায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ধরে রাখতে হবে বাজারে কার্যকর নজরদারি ও স্থিতিশীল নীতি অব্যাহত রেখে। কারণ অতীতেও হঠাৎ ডলারের দাম বেড়ে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, মনিটরিং দুর্বল হলে ব্যাংকগুলোর ভুল সিদ্ধান্ত বাজারকে বিপর্যস্ত করতে পারে। তাই স্থিতিশীল বিনিময় হারের জন্য শুধু ডলারের সরবরাহ বাড়ালেই চলবে না, প্রয়োজন ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি।
ডলারের দরপতন, রেমিট্যান্সে রেকর্ড, রপ্তানি আয়ের উত্থান ও রিজার্ভ বৃদ্ধির এই সমন্বিত চিত্র বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে নিঃসন্দেহে। তবে এই স্বস্তিকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন নীতিনির্ধারকদের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জোরদারি। শুধুমাত্র তখনই এই সম্ভাবনাময় চিত্র বাস্তব স্থিতিশীলতায় রূপ নিতে পারবে।