দেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে আলোচিত ফ্র্যাঞ্চাইজি আসর বিপিএল। বছরে একবার মাঠে গড়ানো এই টুর্নামেন্ট নিয়ে পরিকল্পনার ঘাটতি, আয়োজনে পেশাদারিত্বের অভাব, বিদেশি ক্রিকেটারদের আগ্রহ কমে যাওয়া, স্পনসরশিপ সংকটসহ নানা ইস্যুতে আলোচনা ছিল বহুদিন ধরেই। এসব বিষয় মাথায় রেখেই সম্প্রতি ‘দ্য প্লেয়ার্স মাইক’ নামে একটি মুক্ত আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। উদ্দেশ্য—ক্রিকেটারদের মুখ থেকে সরাসরি শোনা, বিপিএলকে কীভাবে আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও টেকসই করা যায়।
জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণে এই সভা অনুষ্ঠিত হয় মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে। উপস্থিত ছিলেন তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, এনামুল হক বিজয়, জাকির হাসান। ভার্চুয়ালি যুক্ত হন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। আলোচনায় উঠে আসে ফিক্সচার, বিদেশি নিয়ম, মাঠের মান, সম্প্রচার—সবই বিপিএল ঘিরে।
কিন্তু এই আলোচনা যখন রাজধানীকেন্দ্রিক, বিপিএলকেন্দ্রিক, তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন সুরে কথা বলেন ঘরোয়া ক্রিকেটের অভিজ্ঞ ব্যাটার তাসামুল হক। একসময় বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সদস্য ছিলেন তিনি, খেলেছেন ২০১০ সালের যুব বিশ্বকাপে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার অভিষেক ২০১১ সালে।
নিজের ফেসবুক পোস্টে তাসামুল ক্ষোভের সঙ্গে লেখেন, ‘শুধু বিপিএল নিয়েই চিন্তা করেন আপনারা। বিপিএল না হইলে তো আপনাদের আবার সংসার চলে না। দেশের ক্রিকেট এবং দেশের ঘরোয়া লীগের ক্রিকেটারদের স্বার্থের কথা আপনারা কয়জন ভাবেন?’
তাসামুলের মতে, বিসিবির দৃষ্টি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে কেবল তারকা ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের চারপাশে। থার্ড ডিভিশন কোয়ালিফাইং, প্রথম বিভাগের টি-টোয়েন্টি কিংবা বছরব্যাপী ৫০ ওভারের প্রতিযোগিতা—এসবের কোনো ধার ধারছে না কেউ। অথচ জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়া, কিংবা একবার বাদ পড়ে যাওয়া শত শত পেশাদার ক্রিকেটারের জন্য এ গুলোই বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। তাসামুলের মন্তব্যে ফুটে ওঠে বাস্তবের কঠোরতা, ‘গুগল ম্যাপ দিয়েও কামব্যাকের রাস্তা খুঁজে লাভ হবে না।’
জাতীয় দলের বাইরে থাকা খেলোয়াড়দের দৈনিক ম্যাচ ফি মাত্র ৮০০ টাকা—এই বাস্তবতাকে তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সব সুযোগ-সুবিধা জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের দিবেন, আর আমাদের কামলা খাটাবেন। গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার মতো।’
এই বক্তব্য কেবল আবেগ নয়, বাস্তবতা থেকেও বলছেন তিনি। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলা তাসামুল হক প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেছেন ৮৯টি ম্যাচ। ১৫১ ইনিংসে করেছেন ৪ হাজার ৯৪১ রান। ১৩টি সেঞ্চুরি, ২৫টি হাফসেঞ্চুরি, গড় ৩৮-এর ওপরে। সর্বোচ্চ রান অপরাজিত ১৩৫। বোলিংয়ে নামলেও সেখানেও অবদান আছে—১৮টি উইকেট।
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে তার ম্যাচ সংখ্যা ৬৯, রান ১ হাজার ৭৭০। গড় ৩১, রয়েছে ৩টি সেঞ্চুরি ও ৪টি হাফসেঞ্চুরি, সর্বোচ্চ অপরাজিত ১২৬। বল হাতে নিয়েছেন ৯ উইকেট। স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতে খেলেছেন ১১টি ম্যাচ, করেছেন ২৪৮ রান, গড় প্রায় ২৫, দুটি ফিফটি, সর্বোচ্চ অপরাজিত ৬৫। সেইসঙ্গে উইকেট ৫টি। অর্থাৎ তিনি কেবল একজন হতাশ কণ্ঠ নন, বরং দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোরই নিরব সাক্ষী—আর এখন হয়েছেন একজন সরব বক্তা।
বিপিএল নিয়ে আলোচনা যতই হোক, বাস্তবতা হলো, ঘরোয়া কাঠামোর ভিত্তি শক্ত না হলে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট কখনোই দেশের ক্রিকেটকে সমৃদ্ধ করতে পারবে না। প্রশ্ন হলো, বিসিবি কি এবার শুনবে তাসামুলদের কথাও?