নেপথ্যে যুদ্ধ না বাণিজ্য

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক আলোচনার পর প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিতে যাচ্ছেন ইউক্রেনকে। অবশ্য সরাসরি নয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিটি ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ওই ব্যবস্থা কিনবে ইউরোপ। এরপর সেগুলো ইউক্রেনকে দেওয়া হবে। নতুন এই ব্যবস্থার ফলে একদিকে আর্থিকভাবে লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইউক্রেনকে সরাসরি অস্ত্র সহায়তার সমালোচনাও আড়াল করতে পারবেন ট্রাম্প। এজন্যই তার সোমবারের ইউক্রেনসংক্রান্ত ঘোষণাকে কৌশলগত দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলা হচ্ছে। ট্রাম্প রাশিয়াকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করার জন্য দুটি উদ্যোগ ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে কিয়েভে নতুন অস্ত্র পাঠানো এবং আগামী ৫০ দিনের মধ্যে শান্তি না এলে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি। ধারণা করা হচ্ছে, কৌশলগত জায়গা থেকেই এই উদ্যোগ দুটি একত্রে নেওয়া হয়েছে। কারণ ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে এসেছেন। তবে ওভাল অফিস থেকে এই ঘোষণা দেওয়ার সময়ও ট্রাম্প বলেন, এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য তিনি দায়ী নন। ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, কিয়েভ পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন ঠেকাতে চাইলে আমেরিকার অস্ত্র সরবরাহ অপরিহার্য। তিনি বলেন, আমার মনে হয়েছিল, আমরা চার বার চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছিলাম। কিন্তু এটা বারবার দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি আসলে কী?

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর ২১,৬৯২টি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞাগুলোর মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা, রাশিয়ার জ্বালানির দাম বেঁধে দেওয়া এবং ইউরোপের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ জব্দ করা। কিন্তু সেকেন্ডারি ট্যারিফের হুমকি কার্যকর হলে তা একটি বড় পরিবর্তন হবে। এখন পর্যন্ত রাশিয়াকে চীন ও ভারতের মতো প্রধান ক্রেতাদের কাছে জীবাশ্ম জ্বালানি বিক্রি করা থেকে বিরত রাখার পদক্ষেপ নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানÑউভয় দলের আইনপ্রণেুারা ‘স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যাক্ট অব ২০২৫’ নামে একটি বিল পাসের জন্য চাপ দিচ্ছেন, যা রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাস ক্রয়কারী অন্য দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। এই বিলটি পাস হলে রাশিয়াকে সহায়তাকারী যেকোনো দেশের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পাবেন ট্রাম্প।

তেল-গ্যাস রপ্তানির ওপর কতটা নির্ভরশীল রাশিয়া?

জ্বালানি বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ আয় করে রাশিয়া। সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি থেকে আয় ২০২৪ সালে কিছুটা কমলেও তা প্রায় যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়েই রয়েছে। এক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে জ্বালানি রপ্তানিতে সহায়তা করছে ‘ছায়া নৌবহর’ বা শ্যাডো ফ্লিট। এই জাহাজগুলোর মালিকানার তথ্য অস্বচ্ছ এবং বীমার ক্ষেত্রে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, যা তাদের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার রপ্তানি করা মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় অর্ধেক কিনেছে চীন। এর পরেই রয়েছে ভারত। দেশটি প্রায় ৪০ শতাংশ রাশিয়ার তেল কিনেছে। উভয় দেশই প্রচুর পরিমাণে কয়লাও আমদানি করে।

তবে, যুক্তরাষ্ট্র নিজে রাশিয়ার ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করলে এর প্রভাব সামান্যই হবে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার রপ্তানি ছিল ৩ বিলিয়ন ডলার, যা রাশিয়ার মোট রপ্তানির মাত্র ০.৭ শতাংশ। যদিও রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) তেল-গ্যাসের অবদান যুদ্ধ শুরুর বছরের তুলনায় কমেছে, তবু জ্বালানি রপ্তানির ওপর মস্কোর নির্ভরতা এখনো অনেক বেশি। বিভিন্ন হিসাবে দেখা যায়, রাশিয়ার রপ্তানি আয়ের ৫৫ শতাংশ এবং জিডিপির ১৬ শতাংশ (প্রায় ২৮০ বিলিয়ন ডলার) এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে। সেকেন্ডারি ট্যারিফের ফলে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম, বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে তেলের বাজারে তেমন প্রভাব পড়বে না। রাশিয়া থেকে তেল রপ্তানি কমে গেলে যে সংকট তৈরি হবে সেটা ওপেক সামাল দিতে পারবে।

সেকেন্ডারি ট্যারিফের প্রভাব

হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, ট্রাম্প ‘সেকেন্ডারি ট্যারিফ’ বলতে বোঝাতে চেয়েছিলেন রাশিয়ার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক এবং সেইসব দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা যারা রাশিয়ার তেল কিনছে। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে খুব সামান্য বাণিজ্য করে। তাই এই সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞাই মূলত কার্যকর হবে। হোয়াইট হাউজে সিএনএনের ক্যাটলিন কলিন্সকে ন্যাটোতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ম্যাট হুইটেকার বলেন, এগুলো হলো সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা। এটা তাদের ওপর আরোপ করা হবে যারা রাশিয়া থেকে তেল কিনছে। তাই এটা আসলে রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয় নয়। এই নিষেধাজ্ঞা ভারতের মতো দেশ ও চীনের ওপর পড়বে, যারা রাশিয়ার তেল কিনছে। এটি রুশ অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। সোমবারের এই দুই ঘোষণার পেছনে ছিল ট্রাম্পের রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতি নতুন করে জমে ওঠা বিরক্তি। অবশ্য তাদের সম্পর্ক অনেকটা জটিল ও অনেক সময় বিভ্রান্তিকর। একসময় পুতিনের ইউক্রেন আগ্রাসনের প্রশংসা করেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তিনি ক্ষুব্ধ। কারণ তার শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবগুলো মস্কো উপেক্ষা করেছে। ট্রাম্প বলেন, আমার সঙ্গে পুতিনের কথাবার্তা হয় খুব ভালো। কিন্তু রাত হলেই তিনি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়েন। ট্রাম্প দাবি করেন, আগের প্রেসিডেন্টদের মতো তিনি পুতিনের ফাঁদে পা দেননি। তিনি বলেন, ক্লিনটন, বুশ, ওবামা, বাইডেন সবাইকে সে বোকা বানিয়েছে। আমাকে পারেনি।

ট্রাম্পের পাশে বসে রুটে অস্ত্র সরবরাহ বিষয়ক চুক্তিকে একটি ‘গেম-চেঞ্জার’ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন ও নরওয়ে নতুন সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক্সে লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও নরওয়েকে ধন্যবাদ জানাই ইউক্রেনের জন্য নতুন প্যাট্রিয়ট সিস্টেম প্রস্তুতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও কাজ করছি। ইউক্রেন পুরোপুরি প্রস্তুত, সৎ ও কার্যকর শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বাস্তব নিরাপত্তার জন্য। প্রস্তুত নয় রাশিয়াই। ট্রাম্প নিজেও ইউরোপের এই নতুন অবদানে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইউরোপ এখন এই যুদ্ধ নিয়ে অনেক বেশি সচেতন ও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, এই নতুন ব্যবস্থায় ইউক্রেনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র প্যাকেজ পাঠানো হবে। এর মধ্যে থাকবে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, হাউইটজার গোলা এবং মাঝারি পাল্লার আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করতে পারে। এগুলো পরে ইউক্রেনে পাঠানো হবে বলে পরিকল্পনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্যাট্রিয়ট সিস্টেম ইউরোপেই মজুদ থাকলে সেগুলো ইউক্রেনে পাঠানো অনেক দ্রুত হবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে নেওয়া বা নতুন করে উৎপাদনের চেয়ে এটি তুলনামূলকভাবে সহজ ও দ্রুত। কিছু কর্মকর্তার মতে, ইউক্রেনকে নতুন অস্ত্র সরবরাহের এই উদ্যোগ মস্কোর প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে। এটি বোঝাবে, পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের বিরক্তি সত্যিই গভীর। কারণ গত সপ্তাহেই তিনি রুশ নেতার কর্মকাণ্ডকে বাজে কথা বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। এই পরিকল্পনা নিয়ে গভীর আলোচনা হয় গত মাসে নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে। সেখানে ট্রাম্প ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে এই পরিকল্পনার সূত্রপাত আসলে আরও কয়েক মাস আগে। ট্রাম্প নির্বাচনে জয়ের পর থেকেই ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে থাকে। ট্রাম্প তার প্রচারে ওয়াশিংটনের ভূমিকা কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তখন থেকেই ইউরোপীয় কর্মকর্তারা এমন একটি পথ খুঁজতে থাকেন, যাতে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কমালেও ইউক্রেনে অস্ত্র সহায়তা চালু রাখা যায়। গত দুই সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কর্মকর্তারা এই পরিকল্পনার কারিগরি দিক নিয়ে কাজ করছেন। ন্যাটো নিজে সরাসরি ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠায় না। বরং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে অস্ত্র সরবরাহের প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করে। ইউক্রেন সরকার জানিয়েছে, রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিরোধে তাদের ১০টি নতুন প্যাট্রিয়ট সিস্টেম প্রয়োজন।

রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের বিষয়ে রাশিয়ার নিরাপত্তা কাউন্সিলের শীর্ষ কর্মকর্তা দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছেন, ট্রাম্পের ‘লোকদেখানো হুমকিতে’ মস্কো কর্ণপাত করছে না। তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ট্রাম্পের ‘অত্যন্ত গুরুতর’ এই বক্তব্য বিশ্লেষণ করতে রাশিয়া সময় নেবে এবং প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন প্রয়োজন মনে করলে এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন।