সুইদায় ফের সংঘর্ষ, যুদ্ধবিরতিতে ব্যর্থ সিরীয় সরকার

সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্রুজ-অধ্যুষিত সুইদা প্রদেশে ফের দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে। টানা এক সপ্তাহ ধরে চলা প্রাণঘাতী সহিংসতার মাঝেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে পারেনি ইসলামপন্থী নেতৃত্বাধীন সিরীয় প্রশাসন। গতকাল শনিবার শহরের ভেতরে ভারী অস্ত্রের গর্জন ও মর্টার শেলের বিস্ফোরণে ফের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর: রয়টার্স।

রয়টার্স জানিয়েছে, সুইদা শহরে বন্দুকযুদ্ধের আওয়াজ শোনা গেছে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে মর্টারের গোলা আছড়ে পড়েছে। তবে এখনো নির্দিষ্ট করে কতজন হতাহত হয়েছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সরকার জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলে শান্তি রক্ষায় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং সব পক্ষকে যুদ্ধ থামানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকার আরও দাবি করেছে, এখন পর্যন্ত বহু প্রাণহানি ঘটেছে।

গতকাল রাতে সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সুইদা শহরে লড়াই বন্ধ হয়েছে এবং বেদুইন যোদ্ধাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার বিষয়ক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস’ জানিয়েছে, গত সপ্তাহজুড়ে সুইদা ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষে অন্তত ৯৪০ জন নিহত হয়েছেন। রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই সংখ্যার সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বলেন, ‘আরব এবং আমেরিকার মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।’ পাশাপাশি তিনি ইসরায়েলের একাধিক বিমান হামলার সমালোচনাও করেন।

গত ডিসেম্বরে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে সরিয়ে ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে শারার সরকারের জন্য এটি বড় এক চ্যালেঞ্জ। সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় দ্রুজ সম্প্রদায় ও সিরীয় বেদুইনদের মধ্যে। পরবর্তীতে সরকার শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সেনা পাঠালেও, তারা দ্রুজ যোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার ফের দ্রুজ ও বেদুইনদের মধ্যে তীব্র লড়াই হয়।

অন্যদিকে, ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা তাদের দেশের দ্রুজ সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার স্বার্থে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে বিমান হামলা চালিয়েছে। এমনকি, দামেস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়েও বোমা বর্ষণ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র চায়, শারার নেতৃত্বে একটি একীভূত সিরিয়া। তাদের দাবি, শারা সব নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করবেন। তবে ইসরায়েলের ভাষ্য, এই সরকার মূলত জিহাদি গোষ্ঠীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং সংখ্যালঘুদের জন্য হুমকিস্বরূপ।

চলতি বছরের মার্চে সিরিয়ার সেনাবাহিনী আলাউই সম্প্রদায়ের বহু সদস্যকে হত্যা করে। আলাউইরা একসময় সাবেক প্রেসিডেন্ট আসাদের প্রধান শক্তি ছিল।

গতকাল প্রেসিডেন্ট শারা এক বিবৃতিতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘সিরিয়া কোনোভাবে জাতিগত বিভাজন বা সাম্প্রদায়িক উসকানির পরীক্ষাগার হবে না।’

টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি অভিযোগ করেন, ‘ইসরায়েলের হস্তক্ষেপ সিরিয়াকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।’ একই সঙ্গে তিনি দ্রুজ যোদ্ধাদের দায়ী করে বলেন, ‘তারা প্রতিশোধ নিতে গিয়ে বেদুইনদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে।’

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছেন, ‘শারার শাসিত সিরিয়ায় সংখ্যালঘু হিসেবে টিকে থাকা খুবই বিপজ্জনক। হোক সে কুর্দি, দ্রুজ, আলাউই বা খ্রিস্টান।’

যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া ও তুরস্কবিষয়ক দূত টম ব্যারাক শুক্রবার জানান, সিরিয়া ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তিনি দ্রুজ, বেদুইন, সুন্নি এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের আহ্বান জানান একটি নতুন, ঐক্যবদ্ধ সিরীয় পরিচয় গড়ে তুলতে।

গত সাত মাসে ইসরায়েল একাধিকবার সিরিয়ার সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো যেন সামরিকমুক্ত রাখা হয়।

এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েল সুইদায় সিরীয় সেনাদের দুই দিনের জন্য প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে।

সুইদা শহরের পাশের একটি গ্রামের বাসিন্দা মনসুর নামুর বলেন, শনিবার দুপুরেও তাঁর বাড়ির কাছে মর্টার শেল পড়ে। এতে অন্তত ২২ জন আহত হন।

একটি স্থানীয় হাসপাতালের পরিচালক ওমর ওবাইদ বলেন, ‘গত কয়েক দিনের সংঘর্ষে হাসপাতাল পুরোপুরি ভরে গেছে লাশ আর আহত মানুষে। অনেকেই বোমার আঘাতে বুক বা শরীরের অন্যান্য অংশে গুরুতর জখম হয়েছেন, অনেকের হাত-পাও ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।’