তীর-ধনুকে বাজিমাত : চপলের জীবনের গল্পে আরচারির জয়গাথা

কাজী রাজীব উদ্দীন আহমেদ চপল। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক সুপরিচিত নাম। বিগত দুই দশকে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে সফল খেলা আরচারির প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তার হাত ধরে আরচারির আগে দেশের মানুষ পরিচিত হয়েছে অপ্রচলিত খেলা খোখো’র সঙ্গে। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সেফাক টাকরোর মতো খেলা আমদানি করেছেন এই দেশে। যদিও ক্রীড়াঙ্গনে সংগঠক হিসেবে তার পথচলা শুরু হ্যান্ডবল দিয়ে। প্রায় চার দশক ক্রীড়াঙ্গনে তিনি আছেন নানা পরিচয়ে। কখনো তিনি আরচারির, কখনো খোখো’র, কখনো তিনি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। এবার অন্য এক পরিচয়ে আবির্ভূত হয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারজয়ী চপল। নিজের দীর্ঘ পথচলা এক মলাটে বন্দি করে প্রকাশ করেছেন ‘তীর-ধনুকে বাজিমাত’ নামের ৪০৪ পৃষ্ঠার এক গ্রন্থ। রবিবার রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে চপলের লেখা অন্যপ্রকাশ প্রকাশিত বইয়ের প্রকাশনা উৎসব পরিণত হয়েছিল ক্রীড়াঙ্গনের মিলন মেলায়। নানা অঙ্গনের মানুষ উপস্থিত হয়ে যেমন আয়োজনকে আলোকিত করেছেন, তেমনই চপলের আমন্ত্রণে নানা দেশ থেকে উপস্থিত হয়েছিলেন বিশ্ব আরচারির একাধিক নেতারা।

তীর-ধনুকে বাজিমাত মূলত চপলের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ হলেও এই বইকে দেশে আরচারির একটি প্রামাণ্য দলিল বলে দেওয়াই যায়। যেখানে চপল চেষ্টা করেছেন সংগঠক হিসেবে নিজেদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে আরচারির প্রচলনের ইতিহাস, গুটিগুটি পায়ে বীজ থেকে মহীরুহে পরিণত হওয়া সত্য ইতিহাসের উপস্থিতি মিলবে বইটির পরতে পরতে।

২০০১ সালে রাজধানীর আরামবাগে বেড়ে ওঠা চপল নিজ বাসায় বুনেছিলেন আরচারির বীজ। সেই বীজ অঙ্কুরিত হয়ে বৃক্ষ, শাখা-প্রশাখা, লতা-পাতা, ফুল-ফলে হয়েছে সুরভিত। দুই যুগের কম সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল খেলার স্বীকৃতি পেয়েছে আরচারি। ২০১৯ সালে নেপালের পোখারায় অনন্য ইতিহাস গড়ে এসএ গেমসের মর্যাদায় মঞ্চে বাংলাদেশের আরচাররা জিতে নেয় ১০ ইভেন্টের দশ স্বর্ণপদক। আরচারির কল্যাণে এসএ গেমসের ইতিহাসে আগের সব সাফল্য পেছনে ফেলে বাংলাদেশ। হিমালয় জয়েই থেমে থাকেনি চপলের হাতে গড়া আরচারি। পরপর দুটি গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমসে বাংলাদেশের দুই আরচার সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন। ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে আরচার রোমান সানা ইতিহাস গড়ে নাম লেখান দ্বিতীয় পর্বে। সর্বশেষ প্যারিস অলিম্পিকে রোমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন সাগর ইসলাম। বিগত দুই দশকে আন্তর্জাতিক নানা আসর থেকে চল্লিশের বেশি স্বর্ণপদক জিতে নিয়েছেন বাংলাদেশের আরচাররা। আর এ সব কিছুর নেপথ্যে থেকে নিরলস কাজ করে গেছেন চপল। আরচারিকে সেরা অবস্থানে নিয়ে যেতে চপলের নানা বাধা অতিক্রম করার গল্প, দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ রেখে চলেছেন তিনি। আরচারি বিশ্ব পরিমন্ডলে চপল সাংগঠনিক পরিচয়ে পেয়েছেন বিশেষ মর্যাদা। এত কিছু করতে গিয়ে তার এবং তার পরিবারের আত্মত্যাগ, পদে পদে নানা প্রতিকূলতা জয়ের গল্প যেমন তার বইয়ে মিলবে, একই সঙ্গে এ যাবৎকালে আরচারির সব ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে পরিপূর্ণ হয়েছে এই গ্রন্থ।

বর্ষীয়ান ক্রীড়া সাংবাদিক শামীম চৌধুরীর সম্পাদনায় বইটি প্রকাশ করেছে দেশের অন্যতম প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশ। প্রকাশনা উৎসবের আগেই এই বইয়ের প্রথম সংস্করণের বেশিরভাগ বই বিক্রি হয়ে যাওয়ার কথা জানান অন্যপ্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম।

প্রকাশনা উৎসবের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশনের সভাপতি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমান। তিনি বলেন, ‘চপল এত বেশি খ্যাতি সুনাম অর্জন করেছে যা বলে শেষ করা যাবে না। খেলার প্রতি অনুরাগ ও সময় দেওয়ার মধ্য দিয়ে সে প্রমাণ করেছে এর প্রতি তার ভালোবাসা। সে শুধু একজন খ্যাতিমান ক্রীড়া ব্যক্তিত্বই নয়, একজন সফল ব্যবসায়ীও। বইটি ইংরেজি অনুবাদ করার অনুরোধ জানাই।’

অনুষ্ঠানে বিদেশি অতিথিদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ব আরচারির মহাসচিব টম ডিলেন, ইরাক আরচারি ফেডারেশনের সভাপতি আল মাশাহাদানি সাদ, শ্রীলঙ্কা আরচারি অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি সুনেত্রা সেনভিরাথনে। বক্তারা কাজী রাজীব উদ্দীন আহমেদের নিরলস পরিশ্রম, দূরদর্শিতা এবং আরচারি খেলার প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রশংসা করেন। আর চপল আগামী অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের প্রতিশ্রুতি দেন।