বাংলাদেশের কাছে সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতে ১১০ রানে অলআউট হয়ে ৭ উইকেটে হারের পর পাকিস্তানের কোচ মাইক হেসনের কাঠগড়ায় মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের উইকেট। নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য এনে দেওয়া কোচ হেসন পরে আইপিএল দল পাঞ্জাব কিংস ও পিএসএল দল ইসলামাবাদ ইউনাইটেডের সঙ্গেও কাজ করেছেন। অভিজ্ঞ এই কোচের স্পষ্টবার্তা, এই পিচ মোটেও আন্তর্জাতিক মানের নয়।
এই সিরিজেই ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করছেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক রমিজ রাজা। নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ম্যাচের বিশ্লেষণে রমিজ বলেছেন, পাকিস্তান হেরেছে ভুল ব্যাটিং কৌশলের কারণে। অন্যদিকে পেসার শোয়েব আখতারের চোখে পাকিস্তানের হারের কারণ ভুল ব্যাটিং কৌশল বা উইকেট-সংক্রান্ত জটিলতা নয় বরং উইকেট তোলার মতো বোলারের অভাব। নাসিম শাহ এবং শাহিন শাহ আফ্রিদিকে দলে না রাখাতেই জিততে পারেনি পাকিস্তান, একটি টিভি অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে যোগ দিয়ে মন্তব্য রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেসের।
মিরপুরের উইকেট নিয়ে অভিযোগ আছে খোদ বাংলাদেশের ক্রিকেটারদেরই। এই উইকেটে খেলে ব্যাটসম্যানদের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে, এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করেছিলেন সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। বর্তমানের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাসও একই রকম মন্তব্য করেছেন সিরিজ শুরুর আগের দিনের সংবাদ সম্মেলনে। হেসনের অভিযোগকে তাই আমলে না নিয়ে উপায় নেই।
তবে ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটো পাঁচ ম্যাচের সিরিজ বছরের এই সময়টায় আয়োজন করে জয়ের যে নীল-নকশা করেছিলেন সে সময়কার কোচ, টিম ম্যানেজম্যান্টসহ সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা, পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচের পর সেই একই চিত্রনাট্যের সঙ্গে অনেকাংশেই মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, পাকিস্তান তো ঠিক অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ড নয় যে অপ্রস্তুত উইকেটের দ্বিমুখী আচরণ বুঝতে সময় নেবে, তারাও এই উপমহাদেশেরই ক্রিকেটার এবং তাদের অনেকেই রাস্তায় গলির ক্রিকেট খেলেই বড় হওয়া।
রমিজ তাই বলছেন, উইকেটের আচরণের সঙ্গে নিজেদের ব্যাটিং কৌশলের যুগলবন্দিটাই ঠিক করতে পারেনি পাকিস্তান দল, ‘এই মারো নয়তো মরো কৌশলটা পাকিস্তানের জন্য একেবারে নতুন, যাকে বলা যায় একদম কাঁচা। এ রকম একটা চ্যালেঞ্জিং উইকেটে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাটা খুব কঠিন। আমি বলছি না যে ব্যাটিংয়ের ধরনের একদম খোলনলচে বদলে ফেলাটা খুব বাজে একটা ধারণা, তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই পদ্ধতি মেনে কি তারা সব রকম উইকেটে সফল হবে? এটাই আসলে মূল চ্যালেঞ্জ’, টুইটারে লিখেছেন রমিজ রাজা, একই কথা বলেছেন নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলেও।
হেসন দায়িত্ব নেওয়ার পর পাকিস্তানের প্রথম হার, চার ম্যাচে এসে প্রথম হারের দেখা পেলেন এই কিউই। আগের তিনটি টি-টোয়েন্টিই হয়েছিল লাহোরে, বাংলাদেশেরই বিপক্ষে। প্রথম দুটো ম্যাচেই ২০১ রান করেছিল পাকিস্তান, আর শেষ ম্যাচে ১৯৬ রান তাড়া করে জিতেছিল ১৬ বল হাতে রেখে।
সিরিজ শেষে পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আগা বলেছিলেন, পাকিস্তান এখন থেকে ‘ফিয়ারলেস উইথআউট বিইং কেয়ারলেস’ পদ্ধতিতেই খেলবে! যেখানে কমিয়ে আনা হবে ‘অ্যাঙ্কর রোল’, যে কারণেই দলে নেই মোহাম্মদ রিজওয়ান এবং বাবর আজমের মতো ক্রিকেটার। সালমান বলেছিলেন, এক-দুই ম্যাচ হারলেও তারা এই প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে চান না। রমিজ কি হেসনের এই দর্শনকেই প্রশ্নের মুখে ফেললেন?
শোয়েব আখতারের কথাবার্তা তার বোলিংয়ের মতোই। স্পষ্ট, ঠোঁটকাটা, একদম মুখের ওপর বলে দেন, যা মনে আসে। একটি টিভি অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে শোয়েব বলেছেন, ‘পাকিস্তান এখনো সেই যুগে আটকে আছে, যখন তারা সুন্দর একটা শুরুকে পরিণতি দিতে ব্যর্থ হতো। ফখর (জামান) ছাড়াই কেউই কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। আমরা নাসিম শাহ আর শাহিন শাহ আফ্রিদির অভাবটা টের পেয়েছি, তারা টি-টোয়েন্টির বিশেষজ্ঞ বোলার, আর তারা আমাদের দিকে খেলার পাল্লা ঝুঁকিয়ে দিতেও পারত। তবে রানটা বড্ড কম হয়ে গেছে, আর বাংলাদেশ একদম মাপা ও কর্র্তৃত্বপূর্ণ পারফরম্যান্স করেছে।’
শোয়েবের কথায় অবশ্য যুক্তি আছে। অভিষিক্ত সালমান মির্জা মাত্র ৭ রানেই বাংলাদেশের দুই উইকেট তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর আর সুযোগ পাননি বোলাররা। ৯ বছর পর টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের কাছে হার।
সাবেক ক্রিকেটাররা তাই সমালোচনার তীর ছুড়তেই পারেন। হেসনের ক্ষোভটাও ন্যায্য। তবে ম্যাচ জয়ে বাংলাদেশের কৃতিত্ব খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। পারভেজ হোসেন ইমন যে ইনিংসটা খেললেন, অমন ইনিংস খেলতে হেসন নিশ্চয়ই কাউকে না করেননি!