হাতিটা সাদা। এবং বেশ বড়। একে শ্বেতহস্তী বলা উচিত। হস্তিনীও হতে পারে।
রতনের চোখে অস্থিরতা। হাত দুটো পরস্পরকে তালুতে নিয়ে কচলাচ্ছে এমনভাবে!
হাতির জেন্ডার বুঝতে অপারগ হলেও আর সবার মতো একে শান্তির প্রতীক বলে মনে করেছিল রতন। কিন্তু এটা যে ওর জীবনে অশান্তির কারণ হয়ে উঠবে, একদমই ভাবেনি। রতন কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে, আমার হাতে এই যে অফিস আদেশ। এখানে কী লেখা আছে জানেন? শ্বেতহস্তীর পিঠে দড়ি বেঁধে ওটাকে দিয়ে এক আঁটি কচু শাক টেনে নিয়ে যাওয়াতে হবে। সাত দিন সময়।
রতন কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলে, হাতিটা নাকি বেঁচে নেই! তেমন-ই তো শুনলাম।
মরা হাতির দাম লাখ টাকা হতে পারে, মরা হাতি দড়ি বাঁধা কচু শাক টেনে নিতে পারবে না?
এ প্রশ্নের জবাব রতন কীভাবে দেবে? বছর দুই আগে রতনসহ অফিসের সবাই কানাকানি ফিসফাস থেকে শুনেছিল শ্বেতহস্তী অথবা হস্তিনীর কথা। কোনো এক হাই-প্রোফাইলের হাই-প্রোফাইল ভাইস্তার খামারের হাতি নাকি ওটা। সেই হাই-প্রোফাইলের হাই-প্রোফাইল ভাইস্তা বিশাল ইগলের মতো অফিসের মাথায় চড়ে বাধ্য করেছিল হাতিটা কিনতে। তখন হাতি কেনার যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করতে অফিস ক্রয় পরিকল্পনায় বাধ্য হয়ে লিখেছিল এ হাতির ল্যাদা জমা করে রাখা হবে ভবিষ্যৎ প্রয়োজনে। ভবিষ্যৎ মানেই তো সম্ভাবনার অসীমত্ব। ভবিষ্যতে হয়তো কাঁচা ল্যাদার দুর্দান্ত কোনো ইউজ হবে। হয়তো ল্যাদা শুকিয়ে জ্বালানি হবে, হয়তো ল্যাদার গুঁড়ো প্যাকেটজাত করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ছাড়া হবে। হয়তো ল্যাদাই হবে রেমিট্যান্সপ্রবাহ সচল রাখার চাবিকাঠি।
হাতির খাবার হিসেবে কলাগাছ কেনার মাধ্যমে দেশের
কৃষিকে চাঙ্গা রাখার অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করায় বেশ কিছু পুরস্কার অফিসের শোকেসের শোভা বাড়াতে পেরেছে। শে^তহস্তী বা হস্তিনী কেনার পর ল্যাদানো অগ্রগতির তথ্য দিতে হয়েছে সমন্বয় সভা কিংবা নানান দ্বিপাক্ষিক আলাপে। তবে হাতিটা দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলেই কেন যেন কেমন একটা ঠা-া বায়ু কেঁপে গেছে চারপাশে, যেন বা ভূত-প্রেত-প্রেতাত্মার শ্বাস বা খুব অমঙ্গল ঘটে যাবে এমনি পূর্বাভাস ভেসে যেত। ক্রয় পরিকল্পনা অনুযায়ী হাতিটা কেবল ল্যাদাবে, কাউকে খোমা দেখাবে বা পিঠে চড়াবে, এমন নাকি নয়। হাতি কেন দেখতে হবে, হাতির ল্যাদা জমা হচ্ছে, এ যে কত বড় কপাল অফিসের, এ রকমই ছিল হাবভাব।
কোথায় দিয়ে কী হয়ে গেল! কানাঘুষায় জানা গেল যে, হাই প্রোফাইলের চেয়েও হাই প্রোফাইলের আবির্ভাব নাকি ঘটেছে। শে^তহস্তী বা হস্তিনীর ক্রয় পরিকল্পনা তলব করা হয়েছে। এমনও জানা গেল, শ্বেতহস্তী বা হস্তিনী নাকি আর ল্যাদাচ্ছে না। এখান থেকেই গুজব রটেছে, হাতিটা মরেছে। গুজব উড়িয়ে দিয়ে কেউ কেউ বলল, ল্যাদাচ্ছে ঠিকই, তবে বালতির অভাবে ল্যাদা জমানো নাকি যাচ্ছে না। আরও বালতির চাহিদা দিয়ে বাজেট বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। পাওয়া যায়নি। নতুন পরিকল্পনা দাঁড় হচ্ছে, এমনও আন্দাজ অনেকের। হাতিটা যেখানে রাখা আছে, সেই জায়গাটায় ইকো ফ্রেন্ডলি এনভায়রনমেন্ট গড়ে তোলা হবে। কেননা বৈশি^ক জলবায়ু পরিবর্তন দিনকে দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে।
অফিস আদেশ পেয়ে হাতি পরিদর্শনের দুর্লভ সুযোগটা রতন পেয়ে গেল। সত্যি সত্যিই দেখতে পেয়েছিল হাতিটাকে। কাঁচের ঘরে রাখা, পুরোদমে এসি চলছে বলে হিম হিম ঠান্ডায় ওটাকে শ্বেতহস্তী বা হস্তিনী নয়, প্রাগৈতিহাসিক কালের ম্যামথ বলে ভ্রম হয়। যতটুকু দেখেছিল, তাতে রতনের মনে হয় হাতিটার পেছন খুব চকচকে। খুব মসৃণ। কোনো দিন লেদেছিল বলে মনে হয় না। ল্যাদা জমানোর বালতিগুলোও দেখে। একদম নতুন। এগুলোর ভেতর ল্যাদার ফোঁটাটাও পড়েছে বলে মনে হয়নি ওর।
রতন আসলেই এই লাইনে কাঁচা এবং নতুন। কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ কর্তৃত্ব ফলাতে সক্ষম পক্ষ রতনের হাতি পর্যবেক্ষণ রিপোর্টখানার পাতা উল্টাতে উল্টাতে প্রশংসার ফুলঝুরি ছোটালেও রতন পুরোটার অর্থ বোঝে না। বিশেষ করে ম্যামথের সঙ্গে তুলনাটা নাকি খুব ক্রিয়েটিভলি করেছে ও। ফরমাল শার্ট ইনফরমালি কুঁচকে গেলে যেমন লাগে, সে রকম অনুভূতি নিয়ে রতন শোনে, ব্রো! সোজাভাবে ভাবুন। পারফেক্ট হ্যান্ডলিংয়ের উদাহরণ হিসেবে হাতিটার পেছন আর বালতিগুলোকে কেন ধরছেন না?
পারফেক্ট হ্যান্ডলিং! ও আচ্ছা।
পারফরমেন্স অডিট কিন্তু হয়ে গেছে। পাস করে গেছে হাতিটা। এখন আপনি ল্যাদা খুঁজুন আর ল্যাদার বালতি খুঁজুন, কোনোটাতেই কোনো লাভ নেই। মাঝখান দিয়ে অফিস মনে করতে পারে, আপনি ঝামেলা বাধাতে চাচ্ছেন। ঝামেলা কোনোকালেই কেউ পছন্দ করে না। করে, বলুন?
রতনের মুখ সাদা হয়ে গেছে। ঢোক গিলে বলে, কাজটা কীভাবে করব, তা-ই ভাবছি।
রহস্যময় বাঁকা হাসি ঠোঁটে ঝুললেও মুখে কিছু বলল না কর্তৃপক্ষ। হাতের দুই আঙুলের মাঝে দিব্যি একটা আলপিন নিয়ে খেলছেন!
একটু পরে রতন রিকুইজিশন স্লিপ জোগাড় করে বসে গেল ডেস্কে। সময় বাকি দুদিন। দুদিন শেষে হাতি পচে ঢোল না হয় আর কচু শাক যেন তাজা থাকে, এই দুই প্রার্থনায় রতন জোড়া মোরগ মানত করে আর রিকুইজিশন স্লিপে দড়ি ও কচু শাক লিখে দেয়।
বিশ্বাস করুন, এই দুদিন ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখেছে রতন। দুই দিনই দুঃস্বপ্নের প্রধান চরিত্র ওর ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে সক্ষম পক্ষটি। কোনো কোনো সময় দাঁত খিঁচিয়ে বলছে, কচু শাকের দাম আকাশছোঁয়া, তাই কচু শাক মিলবে না। তুমি বাপু ফলিয়ে নাও। এক দিনের ভেতর লকলকে সবুজ কচু পাতা ফলাতে হবে।
এক দিন!
কোনো কোনো সময় দেখে, ওর সামনে ঝুলছে ইঁদুরে কাটা দড়ি। বাঁজখাই কণ্ঠে আদেশ বর্ষিত হচ্ছে, পাটখড়ি থেকে তুলে আন পাট। দড়ি বুনে নাও।
পাটখড়ি কৈ মিলবে? দড়ি কীভাবে বুনতে হয়?
দুশ্চিন্তায় ঘুম থেকে জেগে হাঁফায় রতন। বালিশটা মাটিতে গড়াচ্ছে। রূপপুরের বালিশের সমগোত্রীয় বলেই কী ওর মাথার নিচে আর থাকতে চাইছে না বেয়াদ্দপটা? খুব কান্না পায় রতনের। দুঃখ আর কষ্ট হয় খুব। যেন হাতি কেনার মতো অদূরদর্শী কা-টা ও-ই ঘটিয়েছে। যেন কচু শাকের দাম বেড়েছে ওর-ই কারণে। যেন ও নিজেই সেই ইঁদুর, কচ্ কচ্ করে দড়ি কেটেছে।
বাস্তব কখনো কখনো দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়ানক হয়। সাত দিন হয়ে যাওয়ার পরের দিন অফিসে যেতে যেতে রতন এ রকমটাই ভেবেছে। ওর জন্য অপেক্ষমাণ দুঃস্বপ্ন আজ বাস্তব হয়ে দেখা দেবে। এরপর ছোঁয়াচে রোগের মতো সেটা ছড়িয়ে পড়বে ওর জীবনে। কলির সঙ্গে প্রেমের সমাপ্তি ঘটবে। ঘাটের মড়া বাপটা সত্যিই মরে যাবে। ওকে ভিক্ষে করে খেতে হবে। খেতে গিয়ে দেখবে মুখে দাঁত নেই। কর্তৃপক্ষ এমন থাবড়ানি দেবে, মুখের দাঁত একটাও থাকবে কী?
এরপরও বাস্তবের মুখোমুর্খি হতে হয় বাস্তবে। পেট মোটা হাতিটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কেবল শুঁড়টা নড়ছে অল্প। রিকুইজিশন মোতাবেক দড়ি আর কচু শাক এসে গেল। দড়ি দিয়ে কচু শাকের মুঠো বাঁধা। দড়ির বাঁধনে আটকানো এক আলপিন। ওটাকে টেনে তুলে দড়ির বাঁধন খুলতেই রতনের কানে এলো ফুস শব্দ। ব্যাপক বাতাসে টাল সামলাতে না পেরে প্রপাত ধরণীতল হয় এবং দেখে, হাতিটা উঠে যাচ্ছে সোজা আকাশে। যে পথে ল্যাদাতো হাতিটা, ঠিক সেই পথে বায়ু ত্যাগ করছে। বায়ুর ধাক্কায় উঠছে ওপরে। আরও ওপরে। এবং হাতিটার পেট কমছে। হাতিটার পুরো শরীরই কমে যায় চোখের পলকে। এক সময় হাতিটাকে আর দেখা যায় না। চুপসানো বেলুনের মতো ঝরে পড়ে কারও বাড়ির ছাদে।
রতনের হাতে রয়ে যায় দড়ি আর কচু শাক।