তিনি যেন ক্রিকেটবিশ্বের কাউন্ট অব মন্টিক্রিস্টো—আভিজাত্য, কারিশমা আর রহস্যে মোড়া। ব্যাট হাতে নিলে আলেকজান্ডার দ্যুমার কলমের মতো শব্দ শিল্পী। আবার বল হাতে এলে যেন শেরলক হোমসের ছায়া—ধারালো ও রহস্যঘেরা। হ্যাঁ, তিনি গ্যারি সোবার্স—ক্রিকেট নামের উপন্যাসের চিরকালীন চরিত্র। আজ তার ৮৯তম জন্মদিন।
ক্রিকেট যখন রঙিন হয়নি, তখনই তিনি রাঙিয়েছেন সবুজ মাঠের প্রতিটি কোণ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বার্বাডোজের সন্তান গ্যারফিল্ড সেন্ট অবরুন সোবার্স—পৃথিবী তাকে চিনেছে স্যার গ্যারি সোবার্স নামে। খেলেছেন এমন এক সময়, যখন টেস্ট ক্রিকেটই ছিল একমাত্র আসর; আর তিনিই ছিলেন সেই আসরের সবচেয়ে সম্পূর্ণ, সবচেয়ে মোহময় চরিত্র।
ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং—এই তিন বিভাগের যেকোনো একটিতে দক্ষ হওয়াই একজন ক্রিকেটারের গর্ব। আর গ্যারি সোবার্স? তাকে বলা হতো 'ফাইভ ইন ওয়ান ক্রিকেটার'—কারণ, তিনি একাই পাঁচ জনের কাজ করতে পারতেন।
বাঁহাতি ব্যাটসম্যান হিসেবে ছিলেন অপূর্ব। তার স্ট্রোক প্লে ছিলো ধ্রুপদী সঙ্গীতের মতো—ধীর, সুশ্রী, অথচ গভীর।
বোলিংয়ে বাঁহাতে করেছিলেন পেস, স্লো-মিডিয়াম, এমনকি চায়নাম্যান ও অর্থোডক্স স্পিন! আর ফিল্ডিং? যেকোনো পজিশনে ছিলেন বুলেটের মতো ক্ষিপ্র ও নির্ভরযোগ্য।
১৯৫৮ সালে, মাত্র ২১ বছর বয়সে পাকিস্তানের বিপক্ষে কিংস্টনে ৩৬৫ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে সোবার্স গড়েছিলেন টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড। সেই রেকর্ড ভাঙতে সময় লেগেছিল ৩৬ বছর। ১৯৯৪ সালে ব্রায়ান লারা সেই কীর্তিকে ছুঁয়ে গেলেও, সোবার্সের ইনিংসের মাহাত্ম্য আজও অম্লান।
১৯৬৮ সালে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে খেলার সময়, গ্যারি সোবার্স এক ওভারে ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। ব্যাটসম্যান হিসেবে আগেই কিংবদন্তি ছিলেন, সেই কীর্তিতে তিনি হয়ে ওঠেন রেকর্ডবুকের প্রথম—ক্রিকেটের 'ছয় ছক্কার রাজা'।
বল হাতে স্পিন করতেন, আবার প্রয়োজন হলে পেসও! এমন অলরাউন্ডার ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। তার সম্পর্কে একবার বলা হয়েছিল, 'ক্রিকেট যদি হয় এক মহাসংগীতের আয়োজন, তবে গ্যারিফিল্ড সোবার্স ছিলেন সেই সিম্ফনির একক আত্মা—প্রতিটি যন্ত্রে যার সুর বাজত।'
একবার ম্যাচের মাঝেই ব্যাটিং করার সময় হঠাৎ বললেন আম্পায়ারকে, 'জাস্ট অ্যা মোমেন্ট।' তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক দর্শকের ফ্ল্যাশ ক্যামেরা বন্ধ করতে বললেন। কারণ সে আলো তার চোখে লাগছিল। পরের বলেই মারলেন ছক্কা! এই দৃশ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটভক্তদের মনে আজও জায়গা নিয়ে আছে।
ক্রিকেটে সবসময় শান্ত, সৌম্য ও ভদ্র একজন মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে মাঠের বাইরে মজার মানুষ ছিলেন। একবার সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার ফেভারিট ফিল্ডিং পজিশন কোনটি?'
তিনি হেসে বলেছিলেন, 'যেখানে এক নিমিষেই হাজির হয় পানীয়।'
১৯৭৫ সালে, ব্রিটেনের রানীর পক্ষ থেকে তাকে নাইটহুডে ভূষিত করা হয়। তিনি হলেন Sir Gary Sobers। পরবর্তী সময়ে তিনি ছিলেন বিশ্ব ক্রিকেটের দূত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরবর্তী প্রজন্ম—লারা, হেইন্স, হোল্ডাররা তাকে মানেন পথপ্রদর্শক।
আজ, ২৮ জুলাই ২০২৫—স্যার গ্যারি সোবার্সের ৮৯তম জন্মদিন। মাঠ থেকে অবসর নিয়েছেন কয়েক দশক হলো, কিন্তু যে হৃদয়ে দাগ কাটার মতো তিনি যে ম্যাচগুলো খেলে গেছেন, সেই দাগগুলোতে আজও বাজে তার ছয়ের শব্দ, তার ব্যাটিংয়ের ছন্দ।
'একজন খেলোয়াড় সময়ের গণ্ডিতে বাঁধা, কিন্তু একজন কিংবদন্তি—সে বেঁচে থাকে গল্পে, গানে, গর্বে।'
স্যার গ্যারি সোবার্স, ক্রিকেট নামক শিল্পের শিল্পীকে 'শুভ জন্মদিন'।