দুই বছর আগে নারী ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরেছিল ইংল্যান্ড। তবে মাহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মঞ্চে স্পেনকে হারিয়ে শিরোপা উৎসব করল ইংল্যান্ড। নারী ইউরোর ফাইনালে রবিবার রাতে আগে গোল হজমের পর তা শোধ দেয় ইংল্যান্ড। অতিরিক্ত সময় শেষে খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ইংল্যান্ড জয় পায় ৩-১ এ। ইংলিশদের জয়ের কারিগর গোলকিপার হানাহ হ্যাম্পটন। ১৯৮৪ সালে নারী ইউরোর প্রথম আসরের পর এবার ফের টাইব্রেকারে নিষ্পত্তি হলো ফাইনাল।
টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডের শুরুটা মোটেও ভালো ছিল না। বেথ মিড পা পিছলে পড়ে গিয়ে ‘ডাবল টাচে বল জালে পাঠানোর পর পুনরায় শট নিতে হয় তাকে। এবার তার প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেন স্পেনের গোলকিপার। তবে ইংল্যান্ডের পরের চার শটের তিনটিই খুঁজে পায় জাল। জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়া বার্সেলোনা তারকা আইতানা বনমাতিসহ স্পেনের তিন জন টাইব্রেকারে গোল করতে ব্যর্থ হন। যার দুটি শট ঠেকিয়ে দেন গোলকিপার হ্যাম্পটন।
হ্যাম্পটন টাইব্রেকারের সময় গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে যেন শুধু প্রতিপক্ষের শট ঠেকাতেই আসেননি, এসেছিলেন নিজের সীমাবদ্ধতাকেও জয় করতে। হানাহ হ্যাম্পটন আংশিক দৃষ্টিশক্তি নিয়ে ইউরোপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ইংল্যান্ডকে এনে দিলেন দ্বিতীয় ইউরো শিরোপা। মাত্র ৩ বছর বয়সে হানাহের দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা ধরা পড়ে। ঝঃৎধনরংসঁং নামে এক চোখের ভেতরের পেশিতে জন্মগত সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাকে চোখে অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেই ছোট্ট হানাহকেই বলা হয়েছিল, হয়তো আর কখনো স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলা করতে পারবেন না। কিন্তু হানাহ থেমে থাকেননি। চোখের সেই সমস্যা হানাহকে ব্যতিক্রমী খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। তার শরীরকে নতুন করে প্রোগ্রাম করতে হয়েছে; তিনি অনেকবার মুখে আঘাত পেয়েছেন, আঙুল ভেঙেছেন, নাক থেকে রক্ত ঝরেছে, এই সব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শিখেছেন।
সুইজারল্যান্ডের বাসিলে টাইব্রেকারের আগে ম্যাচের ২৫ মিনিটে এগিয়ে যায় স্পেন। বক্সে ডান দিকের বাইলাইনের কাছাকাছি থেকে ক্রসে হেডে ঠিকানা খুঁজে নেন আর্সেনাল ফরোয়ার্ড মারিওনা কালদেন্তে। বিরতি থেকে ফিরে ৫৭ মিনিটে সমতায় ফেরে ইংল্যান্ড। প্রথমার্ধের শেষ দিকে বদলি নামা কেলির ক্রসে বক্সে হেডে গোল করেন আর্সেনাল ফরোয়ার্ড অ্যালেসিয়া রুশো। এরপর আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে লড়াই চালিয়ে যায় দুই দল। ১২০ মিনিট শেষে টাইব্রেকারে স্পেনের স্বপ্ন ভেঙে উল্লাসে মাতে ইংল্যান্ড। টাইব্রেকারে বনমাতি জালে বল পাঠাতে পারেননি। এছাড়া মারিওনা কালদেন্তে ও সালমা পারাইয়েলো জালে বল পাঠাতে ব্যর্থ হন। বোনমাতি স্পেন সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেন, ‘আমি হতবাক হয়ে গেছি। আমরা সর্বোচ্চ দিয়ে লড়াই করেছি। নিজে পেনাল্টি মিস করায় অবশ্যই আমার ক্ষমা চাইতে হবে এবং ইংল্যান্ডকে অভিনন্দন জানাতে হবে। তবে আমরা ভালো খেলেছি। আমরা তুলনামূলক ভালো দল ছিলাম, যদিও সেটা যথেষ্ট নয় জিততে হলে জালে বল পাঠাতে হবে। আমার মতে, ইংল্যান্ড এমন একটা দল যারা ভালো না খেলেও জিততে পারে। কিছু দল আছে যাদের জেতার জন্য খুব বেশি কিছু দরকার নেই।’
আসর শুরুর পাঁচ দিন আগে ভাইরাল সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল গেল দুবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী বোনমাতি। শিরোপা জিততে না পারলেও টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে হয়েছেন সেরা খেলোয়াড়। কিন্তু শিরোপা জিততে না পারায় ব্যক্তিগত পুরস্কার নিয়ে ভাবছেন না। ‘আমি বিধ্বস্ত, এর (শিরোপা জয়) জন্য আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছিলাম। বার্সেলোনার হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে আমাদের একই অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই হতাশা, এই কষ্ট খুব নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমাদের সবকিছুই খুব খারাপ কেটেছে, কিন্তু আমার মতে, (টুর্নামেন্টে) আমরাই সবচেয়ে ভালো করেছি, সবচেয়ে ভালো খেলেছি এবং আমাদের দলেই সবচেয়ে বেশি মেধাবী খেলোয়াড় আছে।’
তৃতীয় দল হিসেবে নারী ইউরোতে একাধিক শিরোপা জয়ের স্বাদ পেল ইংল্যান্ড। তাদের মতো দুইবারের শিরোপা জয়ী নরওয়ে। আর রেকর্ড আটবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি।