দেশে কৃত্রিম উপায়ে প্রসব বেদনা উঠিয়ে অর্থাৎ ইনডাকশন পদ্ধতিতে সন্তান প্রসবের মাধ্যমে ২০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ সিজারিয়ান কমানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলেছেন, এজন্য স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরে ওজিএসবি হাসপাতালে ‘নিরাপদ প্রসব ও ইনডাকশন পদ্ধতির মাধ্যমে সি-সেকশন হ্রাস’ শীর্ষক এক পরিচিতি সভায় এই তথ্য জানানো হয়। অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
চিকিৎসকরা জানান, সন্তান প্রসবে ইনডাকশন পদ্ধতি হলো প্রাকৃতিকভাবে প্রসব শুরু না হলে কৃত্রিম উপায়ে জরায়ু সংকোচন ঘটিয়ে প্রসব শুরু করানো ও সন্তান প্রসব করানো। সাধারণত যখন গর্ভকাল পূর্ণ (৩৯–৪১ সপ্তাহ) হয়ে গেছে, অথচ প্রসব শুরু হচ্ছে না বা কোনো চিকিৎসাগত জটিলতা দেখা দিয়েছে, তখন ইনডাকশন প্রয়োজন হতে পারে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসী বেগম ফ্লোরা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মুনিরা ফেরদৌসী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওজিএসবি’র সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম।
সেমিনারে জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মোট সন্তান প্রসবের ১০-১৫ শতাংশ সিজারিয়ান হতে পারে। অথচ বাংলাদেশে এই হার ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এই সংখ্যা খুবই উদ্বেগজনক। অথচ ইনডাকশন পদ্ধতি প্রয়োগ করলে এই হার কমপক্ষে ২০ শতাংশ কমানো সম্ভব।
সেমিনারে ডা. মুনিরা ফেরদৌসী জানান, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচালিত এক গবেষণায় ২০০ নারীর ওপর ইনডাকশন পদ্ধতি প্রয়োগ করে সন্তোষজনক ফল পাওয়া গেছে। সেখানে ৬৫ শতাংশ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে এবং গড় সময় কমেছে প্রায় ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিট। কোনো গুরুতর জটিলতাও দেখা যায়নি।
এই চিকিৎসক আরও জানান, এই হাসপাতালে ২৩ জুলাই থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত মোট প্রসবের ৩২ শতাংশ বা ৭২০টি ছিল স্বাভাবিক প্রসব। অথচ সে সময় সিজারিয়ান হয়েছে ৬৮ শতাংশ। এরপরের বছর ইনডাকশন পদ্ধতির সফলতার কারণে স্বাভাবিক প্রসব বেড়েছে ৪ শতাংশ ও সিজারিয়ান কমেছে ৪ শতাংশ।
এই চিকিৎসক বলেন, স্বাভাবিক প্রসব বাড়াতে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও একটি জাতীয় গাইডলাইন তৈরি জরুরি। প্রাথমিকভাবে শহরের হাসপাতালগুলোতে এবং পরবর্তীতে ধাপে ধাপে গ্রামীণ পর্যায়েও এই পদ্ধতি চালু করা হবে। এ ক্ষেত্রে ওজিএসবি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবে ও সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে নীতিমালা প্রণয়নে কাজ করবে।
তবে এই পদ্ধতি সব ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য নয় বলেও সতর্ক করেন ডা. মুনিরা ফেরদৌসী।
অনুষ্ঠানে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. আঞ্জুমান আরা রীতা জানান, আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে আগে যেখানে সিজারিয়ান হার ছিল ৭৩ শতাংশ, ইনডাকশন পদ্ধতি ব্যবহারে তা কমে ৪৩ শতাংশে নেমে এসেছে। আরও ভালো ফল পেতে হলে চিকিৎসকদের উৎসাহ এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ টিম গঠন প্রয়োজন।
অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসী বেগম ফ্লোরা বলেন, ইনডাকশন পদ্ধতি নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়ানো হয়েছে। আমাদের দেশেও এটি কার্যকরভাবে প্রয়োগ সম্ভব।