গদ্যে যার হিমেল আগুন

নক্ষত্রময়, বর্ণবিভাবিচ্ছুরিত আবু হেনা মোস্তফা এনামের আকাশ। কম লেখেন তিনি, পাঠ করেন বেশি। এ কারণে তার কথাসাহিত্য পরীক্ষা-নীরিক্ষার আঁতুড়ঘর। সহজ, মসৃণ, চটুল পথ বর্জন করে শিল্পের সুরভি ছড়ানো বন্ধুর পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। তার লেখায় পরাবাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতার ভেতর দিয়ে উপনিষদের তত্ত্বও প্রকট প্রকৃতি ও জড় সপ্রাণ। গল্পে বিচিত্র রঙের বিন্যাস, চিত্র ও সংগীতময়তা, মনোজগতের সূক্ষ্ম অনুভূতির কারুকাজে সময় ও সমাজ, মানুষ ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক ভাঙন ও রক্ত মুখ দৃশ্যমান। ‘গোলাপ নির্মাণের গণিত’ গল্পগ্রন্থ পড়া শেষে অশেষ এক ব্যঞ্জনা করোটির মধ্যে যা ওজন ও ভরে বহুমাত্রিক দ্বন্দ্বে ও গন্ধে মুখর। নামগল্পে গোলাপগ্রামের জিনিয়া আখতার (চাঁদবালিকা) আর আবু সাইদ (চাঁদবালক) জোছনার ম্রিয়মাণ আলোয় কানামাছি খেলায় মত্ত। গ্রামবাসীদের নিঃশ্বাসে গোলাপের সুগন্ধ। তারপর দেখি সব সুন্দর, সব নদী ও ভোর, ফসল ও গ্রাম শেষ। এসব ধ্বংসের কারণ আগন্তুকরা। ‘তারা বিবিধ কোম্পানির এবং ফ্যাক্টরির মালিক, কেউ বা ম্যানেজার স্বয়ং। এবং তারা হয়তো কারও পাতালপুঞ্জে হিরার খনি, কারও বা পরমাণুবিদ্যা, কারও হয়তো যুদ্ধসরঞ্জাম, হয়তো বা সফটওয়্যার বা গুগল অথবা ফেসবুক কিংবা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি; তাদের হাওয়াঘোড়া আমাদের গ্রাম দাবড়ে বেড়ায়।’ ফলে জিনিয়ারা লুট হয়, আবু সাঈদের বুক ঝাঁজরা হয় বুলেটে, গোলাপগ্রাম স্মৃতিতে ঠাঁই নেয়। বিমানবিধ্বস্ত হয় বিদ্যালয়ের ওপর, শত শত শিশুগোলাপ ঝলসে যায়। নদীখেকো, মাঠখেকো, জলখেকো, বনখেকোদের দৌরাত্ম্যে বাংলাদেশ নামের মানবিক গোলাপবাগান শ্মশান এখন। মনে পড়ে ঘোড়ায় চড়া খিলজি বাহিনীর বিশ্বের অন্যতম পুরনো ও সমৃদ্ধ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার পাঠাগার ধ্বংস করার কথা, রামু-নাসিরনগর হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাবা আলাউদ্দিন খাঁয়ের সংগ্রহশালা নিশ্চিহ্ন করার কথা, সংখ্যালঘু পাড়ায়-গ্রামে আতঙ্ক বিরাজমান, পাহাড়ে হাহাকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা এখন... এসব দেশি-বিদেশি লুটেরা, হন্তারকদের শেষ নেই, যারা যুগে যুগে নিরীহ মানুষ ও প্রকৃতি ধ্বংসে মেতে থাকে। ‘বিন্দুবাসিনী উদ্যান’ গল্পেও প্রকৃতির কথা বলা হয়েছে, যা ধ্বংসপ্রায়, একজন অসহায় গরিব যুবতী মেয়ের কথা বলা হয়েছে যে পুরুষের যৌনগ্রাসে নিশ্চিহ্ন। গার্মেন্টের হাজার হাজার বিন্দুবাসিনী শত হেনস্তা ও শোষণের দরজা পেরিয়ে পরিবার প্রতিপালন করে, নিজেকে মাটির ওপরে দাঁড় করিয়ে রাখে। কিন্তু নতুন কল আসে, নতুন দল আসে যারা কেবল ভোগে ও ভাগে পারদর্শী। ‘তারা কাটাছেঁড়া মানুষের শরীর সেলাই করে, উপড়ানো বৃক্ষ সেলাই করে, হত্যা করা পাখি-পতঙ্গ-ঘাসও সেলাই করতে পারে তারা।’

বিন্দুবাসিনীর সঙ্গী হয় অশোক, তার শরীরে নতুন চারা গজায়, চিরল সবুজ পাতা গজায়। এমন সুদিনে আগুন জ¦লে ওঠে। অন্ধ বাবা বোনো কান্নার স্বরে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে ‘পালিয়ে যা বিন্দা... পালিয়ে যা... বিন্দা!’ এ যেন রাতের আঁধারে হিন্দু এলাকায় হামলা, নরপিশাচের হাত থেকে যুবতী মেয়েকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা একজন বাবার। আগুন লাগে। ভস্মীভূত হয়ে যায় ঘরবাড়ি, নদী, বৃক্ষ, ধুলা, রোদ। বিন্দুবাসিনীকে আর কোথায় খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেক দিন পরে পাখির বিষ্ঠার ভেতর থেকে জন্ম নেয় বটের চারা। বটের ডালে চুপ করে বসে থাকে নিঃসাড় একটা পাখি। পাখির চোখে জল। এমনই সাংকেতিক সংবেদনশীলতায় গল্প শেষ হয়, তৈরি হয় অনিঃশেষ হাহাকার।

‘ধূলি-ওড়া সন্ধ্যার দিকে’র রাখালবালক চটুই, প্রকৃতির সন্তান, সহজ-সরল জীবন সানন্দে কাটায়। কিন্তু ক্ষমতাবান রাজনীতিকদের কারণে শান্তিতে থাকা হয় না তাদের। পুলিশ আর ছুঁচোপার্টির সন্ত্রাসের কারণে চটুইয়ের ভেতরে জন্ম নেয় ভয়। আকলিমা আর চটুইয়ে যুগল-জীবনের শুরু হয় ভয়ে। ধ্বংস থামে না... আকলিমাকে ছিঁড়ে খায় গন্ধমূষিকেরা। চটুইয়ের খুব কান্না পায়, ভেঙে যায় তার স্বপ্নবিলাস। ‘বাতাসও কি দুর্দমনীয়, পাষাণ? না কি তার চারপাশের ঘনায়মান অন্ধকার পৃথিবী একটা লৌহরোলারের মতো সবকিছু চ্যাপ্টা করে দিতে উদ্যত? জীবন তবে কি অর্থহীনতার মর্মস্পর্শী গোলকধাঁধা? সবকিছু অর্থহীন ও পৈশাচিক মনে হয় তার। অর্থহীন ও ক্রুর। ক্রুর ও বিকট হাস্যোন্মাদ। পৈশাচিক ও বিপন্ন।’

তারপর একদিন ভোজবাজির মতো করে আয়নার ভেতরে মিলিয়ে যায় চটুই আর আকলিমা। এমন করে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যায় কিশোরী মেয়ে, তরুণের স্বপ্ন ও মেধা, দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। ‘মৃত্যুসদনের অস্পষ্ট মিউ মিউ’ সাংকেতিক ও ইঙ্গিতময় গল্প। গল্পের মূল চরিত্র মৃত্যুর পর শাহবাগ মোড়ের লাইব্রেরির অন্ধকারে আশ্রয় নেয়। জীবিতাবস্থায় সে খেয়াল করে, ইঁদুরেরা কেবল বইয়ের পাতাই খেয়ে ফেলছে না, সেই সঙ্গে তারা খেয়ে ফেলছে পিঁপড়া, কীটপতঙ্গ, সাপ, এমনকি ধাড়ি বিড়াল পর্যন্ত। ধাড়ি বিড়ালের মতো একটা বড় প্রাণীকে আক্রমণ করছে দল বেঁধে। যেকোনো সময়ে তাকেও খুন করে ফেলতে পারে সন্ত্রাসী ইঁদুরদের দল। ইঁদুরেরা হয়তো পলাতে তার পায়ের দিকে আক্রমণটা চালাবে, অথবা মাথার দিকটায়, অথবা এমনও হতে পারে, ইঁদুরেরা আক্রমণ চালাবে তার গলাতে সরাসরি। মৃত্যুভয় তার ভেতরে জেঁকে বসে। ইঁদুর বাহিনীর হাতে খুন হয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ বিড়াল। সে দেখে, ‘ভাঙা আয়নার টুকরোগুলো ছড়িয়ে আছে এক-একটি বই।’ ক্ষমতাবানরা ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী ও সম্পদের পাহাড় গড়ার নিমিত্তে চেলা-চামুণ্ডার মাধ্যমে যে ত্রাস ও হত্যাযজ্ঞ চালায়, সাংস্কৃতিক স্বৈরাচারী বলয় তৈরি করে তার শৈল্পিক ইঙ্গিতও দৃশ্যমান এ গল্পটিতে। ‘ইঁদুর এবং বাজার বিষয়ক ট্রাভেলগ’ একটি প্রতীকী গল্প। ইঁদুরের মাধ্যমে চাড়ালের সুশীল হওয়া, শপিংমল, রেস্তোরাঁ, মিউজিয়াম, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং স্থাপত্যকলার স্কুলে জেঁকে বসার মতো কাজ তারা সুনিপুণভাবে করে। সভ্য মানুষের সঙ্গে নানান বয়সী ইঁদুরের যোগাযোগে বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘর্ষ লাগছে। দিনে দিনে ভারি হচ্ছে ইঁদুরদের দল। লেখকের মনে শঙ্কা হচ্ছে যে, আলবেয়ার কামুর ইঁদুরদের মতো করে না তারা আবার এ শহর ছেয়ে ফেলে! আসলে তেমন পরিণতিই তো ঘটবার কথা! নয় কি? সংখ্যাগরিষ্ঠরা যদি খুনি হয়, যদি ষড়যন্ত্রকারী হয় তবে কি শেষমেশ জিতে যায় না তারা? ইতিহাস তো সেটাই বলে! অর্থাৎ সাময়িক সুবিধা লাভের জন্য সভ্যরা, রাজনীতিকরা যে হিংস্র কুমির কাছে টানে, এক সময় বংশ বাড়িয়ে তারাই সভ্যদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়। ‘গোলাপ নির্মাণের গণিত’-এর গল্পের বিষয় আর ভাষা অসরল, ব্যতিক্রম তবে দুর্লভ নয়, এখনকার কারও সঙ্গে তা মেলানো যায় না। বঙ্কিম-রবি বলেছেন, কমলকুমারও, প্রত্যেক লেখকের নিজস্ব ভাষা তৈরি করে নেওয়া উচিত। এনাম সেই পথের বেশ সফল পথিক। কাব্যাক্রান্ত এমন অপ্রচলিত গদ্যভাষার সঙ্গে বিষয়ের অনুপুঙ্খ সাযুজ্য রেখে গতিমুখ সামলানো কঠিন, মেদহীনতা বজায় রাখা দুষ্কর। গল্পে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আক্রান্ত হওয়া, তাদের আতঙ্ক-হাহাকার-বিদ্রোহ রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িয়ে সংঘর্ষ, যুগযন্ত্রণার পরোক্ষ প্রকাশ পাঠককে বুঝে নিতে হয় প্রতীক ও চলন দেখে। মোপাসাঁ যাকে বলেছেন, ‘ইল্যুশন অব রিয়েলিটি’, গল্পে তার তীব্র উপস্থিতি লক্ষণীয়। এনামের গদ্যভাষার এমন ধরন, যা সহজাত ও স্বতন্ত্র ছন্দে উদ্ভাসিত, মেকি চেতনা নিয়ে উপহাস করতে খড়গহস্ত। একঘেয়েমি, ভুতুড়ে, সংশয়তার ভেতর দিয়ে আবর্তিত সময় যা ধারাবাহিক নয়, কিন্তু বহুমাত্রিক দৃশ্য উন্মোচনে বদ্ধপরিকর। অসম্মান, নিরুপায়তা আর ক্ষুব্ধতার ভেতরে বাস করা সমাজের নির্বিবাদী, নির্বিরোধী ও প্রতিবাদে অপটু মানুষ এনামের গল্পের মূল চরিত্র, যারা নদীর মতো বহমান, জ্যোৎস্নার মতো সত্য, মেঠো রাস্তার মতো অকৃত্রিম। চরিত্র, ঘটনা, স্থান-কাল এবং ভাষাসহ সবকিছুর সংমিশ্রণের কুশলতায়, বিশ্বাসযোগ্যতায় এবং ফলাফল সৃষ্টিতে শেষমেশ সক্ষম। এসব কারণে সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও খুনবিষয়ক গল্পগুলো আমাদের মন ছুঁয়ে যায়।  