স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় জুলাই অবসান

জুলাই শেষ। বছরও পার হয়ে গেল। গত বছরের ঘটনাবহুল সে সময়ে জুলাই আন্দোলনের সফল পরিণতির প্রতীক্ষা তখন। জনমনে তখন একদিকে ভালো কিছুর প্রত্যাশা, অন্যদিকে সংশয়। রাজধানীর বাইরে জেলায় জেলায়, কোথাও উপজেলায় মিছিলের কলেবর বাড়ছে, সেøাগানের উত্তাপ তীব্রতর হচ্ছে। চাকরিতে কোটাপ্রথা বাতিলের যে দাবিতে জমায়েত আর মিছিলের শুরু, দাবির শব্দ তখন বদলে গেছে। এক দফা এক দাবিতে দেশ তখন তরঙ্গিত। সব কণ্ঠে এক আওয়াজ বিদায় নাও হাসিনা, দূর হও হাসিনা। এক বছর আগের বিক্ষুব্ধ ওই দিনগুলোর চিত্র এবং শব্দাবলি এখনো নিশ্চয়ই সবার চোখে স্পষ্ট, কানেও নিশ্চয়ই প্রতিধ্বনি তুলছে। সর্বব্যাপী ন্যায্য সংগ্রামের তখন আর পিছু হটার, পরাজিত হওয়ার কোনো শঙ্কা ছিল না। নিপীড়ক শাসক এবং তার নিপীড়ন কাঠামো, অস্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট লোকজনের গর্জন-লাফালাফিও তখন ছিল ধিক্কৃত একটি গোষ্ঠীর মরিয়া আর্তনাদ আর কাতরানোর মতো। চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিম, রংপুরের আবু সাঈদ, ঢাকার উত্তরায় মুগ্ধ, নিরস্ত্র মিছিলে হতাহতের সংখ্যা তখন বেড়েই চলেছে। শাসকের জারি করা সান্ধ্য আইন তখন কে মানে? জবরদখলকারী শাসক ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিদায়, পলায়ন এবং এদের কায়েমি দুঃশাসনের কবল থেকে মুক্তির ও বিজয়ের আকাক্সক্ষায় তখন দেশ আন্দোলিত। ২০২৪ জুলাইয়ের শেষ কটি দিনের সংক্ষেপ আলেখ্য এমনই।

আজ যেমন শুরু হলো নতুন বছরের নতুন মাস আগস্ট, তেমনি তখনো চোখের সামনে মনের দিগন্তে ছিল নতুন এক বিজয়ী আগস্টের আলোড়ন। সরাসরি মিছিলে-সমাবেশে অবস্থানরত ছাত্রনেতৃত্বও তখন দিচ্ছে বরাভয়, শোনাচ্ছে আগামীর বিজয় বার্তা। তখনো সংবাদপত্রগুলো কর্র্তৃত্ববাদী নিষ্ঠুর শাসকের জাঁতাকলে হাঁসফাঁস। এর মধ্যেই যতটুকু পারছে, পত্রিকাগুলো মানুষকে সত্য সংবাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে। কর্মী-সাংবাদিকরা তখন দল-মতের খোলস ফেলে দিয়ে মহত্তম এক গণসংগ্রাম গণমিছিলের বার্তাবাহকে রূপান্তরিত। পেশাজীবী নানাজন যারা অবসরে, তারা প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে, যারা চাকরিতে, তারা নানা কৌশলে নিজেকে আড়াল করে কোনো না কোনোভাবে মিছিলের আন্দোলনের সহযাত্রী। রোমাঞ্চকর বিগত ওই জুলাইয়ের দিনগুলোর সেই অনুভূতি। সবার তখন এক আশা ও এক প্রার্থনা, দূর হোক, বিদায় নিকএই রক্তলোলুপ প্রাণসংহারী লুণ্ঠক শাসক। ফ্যাসিস্ট কবলমুক্ত এদিনে নতুন দিনের প্রত্যাশায় আমাদের স্বপ্নের কিছু প্রেক্ষিত উল্লেখ করতে চাই। কী আমাদের চাওয়া? আমরা একটি কর্তৃত্ববাদী নিপীড়ন-আশ্রয়ী সরকারের অবসান ও পলায়ন দেখেছি। বিশ্বনন্দিত এবং দেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন-সিক্ত নোবেলজয়ী প্রাজ্ঞ প্রবীণের সরকার এখন সমাসীন। কিন্তু নতুন স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এখনো কি গিয়েছি আমরা? বলতে হবে, সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন এখনো মনে হয়, বহু দূরের ব্যাপার। কেন এমন সংশয়ের দোলাচলে আমাদের সমাজ? মাসের পরিচয় ছাড়াও ইংরেজি আগস্ট শব্দটির আভিধানিক অর্থ যেখানে সুমহান, শ্রদ্ধা ও শুভব্যঞ্জক কর্ম ও সময় নির্দেশ করে, সেখানে এই আগস্ট শুরুতে আমরা নানা দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছি। কত উপদেষ্টা, কত সহকারী, বিশেষ সহকারী, বিশেষ উপদেষ্টা, কত কমিটি কমিশনের সদস্য, চেয়ারম্যান, সহসভাপতি নিয়ে শতাধিক ব্যক্তির লটবহর-সংবলিত যে অন্তর্বর্তী সরকার এখন চলছে, ধারণা করি, এ সরকার তার লক্ষ্য সম্ভবত এখনো নির্দিষ্ট করতে পারেনি অথবা তা নির্দিষ্ট করতে পরাক্সমুখ।

আমরা বলব, বিগত বছরের আন্দোলনটি বেগবান হয়েছিল এ কারণে যে, তখন সরকার ছিল গণতন্ত্রের বিবেচনায় জনসমর্থনশূন্য জবরদখলকারী। নিষ্পেষিত রাজনৈতিক দলগুলো, তাদের কর্মী ও নেতারা কখনো তা উচ্চকণ্ঠে বলেছেন, কখনো নিপীড়ন-তাণ্ডবে বলতে পারেননি। কিন্তু তাতে সত্যের হেরফের হয়নি। জনদৃষ্টিতে একটি অনির্বাচিত, জনসমর্থনবিহীন লুণ্ঠনবাজ সরকারের অবসান এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকারের প্রতিষ্ঠা ছিল জনগণের একান্ত আকাক্সক্ষা। এরই সঙ্গে প্রত্যাশা ছিল, লোকের জীবনযাপনের সহায়ক হবে সরকারের সব কার্যক্রম। কিন্তু এখনকার বাস্তবতা একেবারেই ভিন্নরূপ। নেই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের যথাবিহিত ব্যবস্থা, নেই নির্বাচনের দিনক্ষণ। অর্থনৈতিকভাবেও আমাদের দেখতে হচ্ছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বহর। গত আমলের তুলনায় ১১ মাসে খেলাপি ঋণ অর্থাৎ ব্যাংকের অর্থ লোপাটের পরিমাণ বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। কোটিপতির সংখ্যার চলছে ক্রমবৃদ্ধি। রাজনৈতিক দলের যাত্রা শুরু দখলবাজি চাঁদাবাজি দিয়ে। আর চলছে অনাহূত বিতর্কের কূটচাল। জুলাই আন্দোলনকে অযথা স্বাধীনতাযুদ্ধের চেয়ে বড় করে দেখানোর কুতর্ক আর সংবিধান বাতিল এবং নতুন সংবিধান লেখার অভাবনীয় কথাবার্তা পুরো দেশ এবং সমাজকেই বিগত আন্দোলনের সফল নেতৃশক্তির প্রতি করে তুলেছে বিদ্বেষপ্রবণ। অথচ সহজ কাজটি ছিল দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য অংশগ্রহণমূলক যথার্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে, যা কিছু সংযোজন-বিয়োজন দরকার, তা সম্পন্ন করা এবং নির্বাচন লক্ষ্যে সুশাসন ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনা। দুঃখ, বেদনা ও হতাশার সঙ্গে বলতে হয়, এর কিছুই হয়নি। ভাবি, এমন স্বপ্নভঙ্গই বোধ হয় আমাদের রাষ্ট্র ও জাতির ললাটলিপি। ৭২-এ হলো না গণতন্ত্রের সূচনা ও চর্চা। ৯০-এর পর ক্ষণিকের জাগরণ এবং মাত্র কয়েক বছরেই তারও সমাপ্তি। এবারও ফ্যাসিবাদী লুণ্ঠক শাসক-পরবর্তী যে স্বপ্নের বাস্তবায়ন ছিল প্রার্থিত, সেই স্বপ্নেরও বুঝি এখন ঘটতে চলেছে মৃত্যু!