পরিবর্তন হচ্ছে কোথায়?

সম্প্রতি সিরডাপ মিলনায়তনে ফলিত ও লোক-অর্থনীতির প্রবক্তা হোসেন জিল্লুর রহমানের ‘অর্থনীতি শাসন ও ক্ষমতা যাপিত জীবনের আলেখ্য’ বইয়ের পাঠ উন্মোচন অনুষ্ঠানে এ সময়ের রাজনৈতিক অর্থনীতির কুশীলবরা যোগ দিয়েছিলেন। বইটির শিরোনামকেন্দ্রিক আলোচনার সারবস্তু নিম্নরূপ : তাৎক্ষণিকভাবে গণতন্ত্র উত্তরণে তথা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নির্বাচনে যাওয়া একটি অন্যতম পথ সন্দেহ নেই। কিন্তু নির্বাচনটি সুষ্ঠু হবে কিনা, নির্বাচকম-লী জনগণ প্রকৃতপক্ষে বারবার প্রতারিত হবে কিনা সেটি বাছ-বিচারের জন্য সময় নেওয়াটাও যেন গণতন্ত্রের জন্য সুখকর পথপরিক্রমা হবে না। ইঙ্গিত এই এত আগে এত সংস্কারের প্রয়োজন কী? অবশ্যই তো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য যে রক্তদান, যে আন্দোলন ও আত্মত্যাগ তা স্রেফ স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও পুনঃপ্রবর্তনের প্রয়াসমুখী হতে হলে নির্বাচনে যেতে দেরি করা সমীচীন হবে না। কেননা নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হলে কে, কীভাবে ক্ষমতার মসনদে যেতে পারবে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজিকে পাকাপোক্ত করতে পারবে, একে অন্যের ওপর দোষারোপের সুযোগ পেতে সবাই সাধ্যমতো দৌড়ঝাঁপে মেতে উঠতে পারবে সেদিকে দেশ ও জাতিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য নির্বাচন তাড়াতাড়ি দরকার। এ কথা ঠিক, সংস্কার একদিনে হবে না এক যাত্রায় হবে না। এর জন্য ১৫ বছর পর পর স্বার্থ ত্যাগ ব্যতিরেকে আন্দোলন ও আত্মত্যাগের প্রয়োজন হবে। নিষ্ফলা মাঠের কৃষককে স্থায়ী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা থেকে প্রশাসন ও বাহিনী সমুদয়কে এমনভাবে এমন অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়েছে দুধ কলা খাইয়ে সিন্ডিকেটের সাপ পোষা হয়েছে যেভাবে খাল কেটে কুমির আনা হয়েছে, তার থেকে নিষ্কৃতি এত সহজে মিলবে কি? অবস্থা এমন যে, স্বয়ং স্বৈরাচারী মনোভাব মনোভঙ্গি গ্রথিত হয়ে গেছে তাকে উপড়ে ফেলা তো দূরের কথা, মনে হতে পারে স্বৈরাচার না হলে দেশ রাষ্ট্র অর্থনীতির সংসার চালানো যায় না বা যাবে না। দেখানো শুরু হয়ে গিয়েছে যুগে যুগে স্বৈরাচাররাই ছিটেফোঁটা উন্নয়ন করে স্বৈরাচারের পয়দা ও বড় করার পথ পেয়েছে। সে কারণে স্বৈরাচারের জন্য ব্রেখশট-এর নাটক ‘গডোর জন্য অপেক্ষা’র চর্চা থেকে মন ফেরানো যাচ্ছে না, গণতন্ত্রের জন্য অপেক্ষার নাটক কিংবা তাকে কাদম্বিনীর মতো মরিয়া প্রমাণ করতে হচ্ছে, সে মরে নাই। উভয় ক্ষেত্রে ধৈর্যের বড় অভাব প্রতীয়মান হচ্ছে।

আলোচনায় উঠে এলো, সাহস করে বলাও হলো মুক্তিযুদ্ধের ফলাফলের ওপর রক্তদানকারী জাতির নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তাদের রক্ত মাড়িয়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে শোষণ ও বঞ্চনাবিহীন দেশ, জাতি ও অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অন্যরা আত্মসাৎ করে নিজেদের বিজয় ভেবে জ¦লন্ত কড়াই থেকে আরেক উত্তপ্ত উনুনে ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশের সংগ্রামী মানুষকে। একই কায়দায় বর্তমানে, বিশেষ করে, বিগত এক বছরে গণঅভ্যুত্থান-উত্তর পরিবেশ পরিস্থিতিতে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সালতামামিতে দেখা যায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে নানান বিভ্রান্তির বেড়াজালে বাধার চেষ্টা চলেছে। এখানেও ঘরে ও বাইরের আঁকা কৌশল বাস্তবায়নে সম্মিলিত প্রয়াস বেগবান হয়েছে। অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের বৈপ্লবিক বিচার করতে না পারায়, প্রকারান্তরে ফলাফল হলো ওই সব অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল হচ্ছে বা হবে। ফলে এর বিপরীতে অস্থির ও ধৈর্যহীন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পাচ্ছে। মব জাস্টিস জাতীয় আত্মঘাতী কর্মকা-ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের উদ্যোক্তা ও যোদ্ধাদের চরিত্র ও মনোবল অটুট অক্ষত রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। তাদের এহেন হীনবলকরণও এমন একটি কৌশল, যাতে ভবিষ্যতে আন্দোলনে দানা বাঁধতে বা নৈতিক সমর্থন আদায়কে অসম্ভব করে তুলবে। তাহির স্কয়ার কিংবা তিউনিসিয়ার বিপ্লব যে কারণে কাজ করতে পারেনি। গণতন্ত্রের প্রতিপক্ষ পলাতক ফ্যাসিস্ট আমলে সমাজ ও অর্থনীতি এমনভাবে পরিচালিত ও পরিচিতি পেয়েছে যে, তাকে এখন উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই উল্টাপাল্টা পথে হাঁটা অব্যাহত রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের পর থানার ছোট-বড় দারোগা, এসিল্যান্ড, এজি ও ভূমি অফিসের কেরানি, রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজের কন্ট্রাক্ট ও কার্য সহকারী, বিবিধ বোর্ড ও কমিশনের কর্তারা, কারও আচার-আচরণে কোনো পরিবর্তন তো আসেইনি বরং তাদের সেবা খরচ বাড়ছে। সিন্ডিকেট আগের জমানায় যে অর্থ লোপাট বা লুটপাট করেছে, সে টাকা এখন এই সমাজকে স্বভাবে চরিত্রে আরও খাই খাইভাবে খাওয়ার জন্য গাঁটের পয়সা খরচ করে ইন্ধন দিচ্ছে সিন্ডিকেট। পলাতক সরকারের সাগরেদরা বসে বসে সেই কাজটিই করছে যাতে বৈষম্যবিরোধীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়, তাদের ঐক্যবদ্ধতায় ফাটল ধরে, তাদের অকুতোভয় মনোবল ভেঙে পড়ে, চরিত্র বল হারায়, হেয় হতে হতে কণ্ঠস্বর নিচু হয়। শোনা যায়, বাংলাদেশ নাকি খুব শিগগির মধ্যম আয়ের দেশে প্রমোশন পেতে যাচ্ছে। অথচ এখনো সবার আদব-কায়দা, অভাবের স্বভাব, জ্ঞান কা-জ্ঞানে জিপিএ ফাইভ তো দূরের কথা জিপিএ ২ পাওয়ার যোগ্য লেখাপড়া, স্বাস্থ্যসেবা ঘটে জোটে নাই। আলোর নিচে যেমন অন্ধকার, বড় বড় লোকালয়ের পশ্চাদভূমি যেমন ঢাকার অদূরে কালীগঞ্জ, খুলনার কাছে ডুমুরিয়া, কলকাতা ও যশোরের কাছে শৈলকুপা ও হরিণাকু-ু তেমনি ময়মনসিংহের গফরগাঁও নানান কিসিমের ত্যক্ত, বিরক্ত, পরিত্যক্ত এমনকি বামপন্থি মানুষের অভয়ারণ্য ছিল এক সময়। এমনটি এক দিনে হয়নি। সেই সব লোকালয়ের লোকেরা এখনো এমডিজি, এসডিজির অনেক গোলের সাফল্যের দাবিদার হলেও, এখনো তারা গোলশূন্য। এখনো লোকে বলা বলি করে, গনি মিয়া একজন কৃষক। তার নিজের জমি নাই, সে অন্যের জমি চাষ করে খায়। হ্যাঁ, একসময় এমনতরো পরিচয় তার ছিল। কিন্তু এখন গনি মিয়াদের সামান্য ক্ষতির বদৌলতে কেউ কেউ আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। এখন বিনামূল্যে বিতরণকৃত পাঠ্যবইয়ে তার কথা নাই। থাকবেই বা কেন। দেশের সব মানুষের মাথাপিছু আয় যখন হাজার হাজার টাকা তখন গনি মিয়াদের মাথাপিছু আয়ের হিসাব মেলে না, তাই তাদের নাম পরিচয় সেখানে অপাঙ্্ক্তেয় তো বটেই। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়েছে ধনী-গরিব সবাইকে ৮০০/৯০০ টাকার পাঠ্যবই বিনামূল্যে দিয়ে তাদের হাজার হাজার টাকার গাইড বই কেনাতে হচ্ছে। গনি মিয়াদের ট্যাক্সের টাকায় পুরো বেতন দিয়ে রাখা শিক্ষকদের ক্লাসে না পড়িয়ে কোচিং ক্লাসে পড়ানোর নামে ন্যায়নীতি নির্ভরতার জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে গনি মিয়াদেরই পকেট মারা হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবায় এখন সেবার নাম গন্ধ নেই, ক্লিনিকের কসাইখানায় গনিমিয়ারা।

গনি মিয়াদের কেউ কেউ এখন সামাজিক নিরাপত্তা জালে আটকা। তাকে খাওয়ানো পরানো এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব পয়সা বানানোওয়ালাদের হাতে চলে গিয়েছে। যাদের হাত ঘুরে সামাজিক নিরাপত্তার টাকা আসে তা দিয়ে দরিদ্রতার অসহায়ত্বের গ্লানি ঘোচে না। বরং বাড়ে। অথচ তাদের ঘরের বেকার ও বখে যাওয়া সন্তানদের সদগতির লক্ষ্যে তাদের দক্ষ করে যদি বিদেশে পাঠানো যেত, তাহলে তো সেটাই হতো সামাজিক নিরাপত্তা বোধের বাস্তব বিধান। অর্থনীতি ও রাজনীতি এ দুয়ের মধ্যে কে বড় কে ছোট, কে কার দ্বারা কতখানি প্রভাবিত, উদ্বুদ্ধ কিংবা পরিচালিত হয় তা আরও বিশ্বব্যাপী কোথাও খোলাশা করা সম্ভব হয়নি। কেননা যুগে যুগে স্থান, পাত্র ও প্রক্রিয়াভেদে অর্থনীতি ও রাজনীতি অধিকাংশ সময়, অনিবার্যভাবেই সমতালে ও সমভাবনায় এগিয়ে চলছে। চলারই কথা। কেননা মনে হয়েছে বড্ড পরস্পর প্রযুক্ত এরা। যদিও অনেক সময় এটাও দেখা গিয়েছে রাজনীতি অর্থনীতিকে শাসিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ করেছে : আবার অর্থনীতি রাজনীতিকে অবজ্ঞার অবয়বে নিয়ে যেতে চেয়েছে বা পেরেছে। এ কথা ঠিক, বহমান বর্তমান বিশে^, ক্রমে, অর্থনীতিই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের পথে নিয়ে যাচ্ছে। কেননা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে শুরু করে, সব পর্যায়ে শিক্ষা স্বাস্থ্য বিনোদন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সব কিছুতেই নীতিনির্ধারণে অর্থ নিয়ামক ভূমিকায়। সিদ্ধান্ত হয় আর্থিক প্রভাবের, সক্ষম সম্ভাবনার নিরীখে। রাজনীতি নীতিনির্ধারণ করে অর্থনৈতিক জীবনযাপনকে জাবাবদিহি, সুশৃঙ্খল, সুশোভন, সুবিন্যস্ত করবে এটাই ঠিক। কিন্তু নীতিনির্ধারক যদি ভক্ষক হয়ে নিজেই অর্থনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টির কারণ হয়, তখন আমজনতার অর্থনৈতিক জীবনযাপন পোষিত (facilitated, 
supported) হওয়ার পরিবর্তে যদি নিজস্ব তাগিদে ও প্রয়োজনে নিজস্ব উপায়ে সংগ্রহে ব্যাপৃত হতে হয়, তখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের এখতিয়ার ও ক্ষমতা খর্ব হয়। আইনসভায় নীতিনির্ধারক বিধিবিধান তৈরি করবেন সবার জন্য প্রযোজ্য করে, নিরপেক্ষভাবে, দূরদর্শী অবয়বে। কিন্তু সেই আইন প্রয়োগে নীতিনির্ধারক নিজেই নিজেদের স্বার্থ অধিকমাত্রায় দেখতে থাকেন তাদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে, প্রতিপক্ষরূপী বিরুদ্ধবাদীদের বঞ্চিত করতে স্বেচ্ছাচারী অবস্থান গ্রহণ করেন তখন ওই আইনের প্রয়োগে নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয়-সন্দেহ তৈরি হয়। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আমজনতার আগ্রহ নেতিবাচক মনোভাবে ও সর্বোপরি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে।

দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে উন্নয়ন কর্মসূচি পরিপালিত হবে দলমত নিরপেক্ষভাবে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুযোগ-সুবিধা অধিকার আদান-প্রদান, নীতি-নিয়মকানুন, আইনশৃঙ্খলার বিধানাবলি বলবৎ, প্রয়োগ ও বাস্তবায়িত হবে এটা সাংবিধানিক সত্য ও প্রথা। কিন্তু যদি দেখা যায়, ক্ষমতাসীন নীতিনির্ধারক তা শুধু নিজের, নিজের এলাকায়, গোত্রে, দলে ও কোটারীর মধ্যে বরাদ্দ বিভাজন সীমিত করে ফেলে এবং বিরুদ্ধবাদীদের বঞ্চিত করায় মেতে ওঠে তাহলে সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে পারে। এখানে, এরূপ পরিবেশে রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে, নিয়ন্ত্রক ও নিয়ন্ত্রিতের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি উৎপাদনে সম্পদে সংসার সমাজসহ নীতিনির্ধারককেও একটি রূপময়, বেগবান, ঐশ্বর্যম-িত ও আনন্দঘন সক্ষমতা দান নির্মাণ করবে কিন্তু রাজনৈতিক নীতিনির্ধারক যদি ভুল পদক্ষেপের দ্বারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা, সমৃদ্ধির সক্ষমতা ও সুযোগকে প্রশ্নবিদ্ধ-পক্ষপাতযুক্ত, দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলে তাহলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিবেশ হয় বিপন্ন। এর ফলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা শুধু দ্বিধাগ্রস্ত নয়, বাধাপ্রাপ্তও হয়।

লেখক: অনুচিন্তক

mazid.muhammad@gmail.com