ফেনীর তিন উপজেলা ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়ার গত ৮ জুলাই ভয়াবহ বন্যায় মুহুরি, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর ৪২টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। বন্যা শেষে এখনো সেসব বাঁধ মেরামত হয়নি। এতে ১৩৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েক লাখ মানুষ, ক্ষতি হয়েছে ফসল, সড়ক, সেতু ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। গত বছরের ভয়াবহ বন্যার এক বছর পার না হতেই বন্যায় আবারও বাঁধ ভাঙায় আতংকে রয়েছে স্থানীয়রা।
আকাশে মেঘ জমলেই আতঙ্ক দেখা দেয় ফেনীর নদীতীরের বাসিন্দাদের মধ্যে। গত বছরের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত না শুকাতেই এ বছর আবারও বৈরী আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে। সাগরে নিম্নচাপ বা টানা বৃষ্টির পূর্বাভাস দেখলেই কপালে পড়ছে শঙ্কার ভাঁজ। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, আতঙ্কিত না হয়ে- সবাইকে সতর্ক থাকতে। ফেনীতে গত শনিবার থেকে দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে জনজীবনে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। ভারী বৃষ্টির কারণে শহরের বেশ কিছু নিচু এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা দেখা গেছে।
অপর দিকে ২০ জুলাই বাঁধ মেরামত কাজ শুরু করলে নদীর পানি বেড়ে যাওয়া মেরামত কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বাঁধ মেরামত করতে না পারায় গত ২১ জুলাই ভারতের উজানের পানির চাপে ভাঙ্গা স্থান দিয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকে চিথলিয়া ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রাম দ্বিতীয় দফায় প্লাবিত হয়।
এরই মধ্যে শুক্রবার থেকে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। এতে ভাঙা বাঁধ দিয়ে আবারও নদীর পানি ঢুকে ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা স্থানীয় বাসিন্দাদের। টেকসই বাঁধ নির্মাণসহ ৮ দফা দাবিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড অভিমুখে পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২৩ জুলাই) সকালে ফেনী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মহিপাল পানি উন্নয়ন বোর্ড অভিমুখে এ পথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে এক মাস ধরে বিভিন্ন সংগঠন দ্রুত বেড়িবাঁধ মেরামত করে বন্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য মানববন্ধন করে যাচ্ছে। সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে আয়োজিত ও ফেনী প্রবাসী উদ্যোগের সার্বিক সহযোগিতায় এতে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকজন অংশগ্রহণ করেন। এর আগে পরশুরামে ৫৬ টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দ্রুত বেড়িবাঁধ মেরামতের দাবিতে মানববন্ধন করেছে।
মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কারণে এই বৃষ্টি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অফিস। আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া বার্তা অনুযায়ী, আজ খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বেশির ভাগ জায়গায় বজ্রসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে। এসব বিভাগের কোনো কোনো জায়গায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসও আছে। টানা বৃষ্টি হলে মুহুরি, কহুয়া, ও সিলোনিয়া নদীর পানি আবারো বেড়ে যাবে।
জানা গেছে, গত বছরের আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতির রেশ কাটতে না কাটতেই চলতি বছরের ৮ জুলাই ভারতের পানির চাপে মুহুরি, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর অন্তত ১৫টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এতে উপজেলার ২৫ টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়। ভয়াবহ বন্যায় ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, কালভার্টের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
দ্রুত বেড়িবাঁধ মেরামতের দাবিতে আবু তালেব রিপন বলেন, বেড়িবাঁধের ভাঙন স্থানে এখনো মেরামত হয়নি। বৃষ্টি বেশি হলেই ভাঙনকবলিত বাসিন্দাদের আবারও বন্যার কবলে পড়বেন। বাঁধ-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা চরম আতঙ্কে রয়েছেন।
পরশুরামের নিজ কালিকাপুরের বাসিন্দা শফিক আহম্মদ বলেন, গত বছরের বন্যায় সব হারিয়েছি। বাশেঁর বেড়ার ঘরে জোড়াতালি দিয়ে বসবাস করছি। রাত এলেই ভয়ে থাকি, কখস টানি এসে আবার সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, মুহুরি নদীর বাঁধের যে স্থান দিয়ে পানি ঢুকেছিলও সেই বাঁধটির কাজ এখনো হয়নি। ভারি বৃষ্টি হলেই সেখান দিয়ে ঢুকবে পানি।
ফুলগাজী উপজেলার স্থানীয় সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম রাজু বলেন, গত বছরের বন্যা আতংকের কারনে বৃষ্টির শুরু হওয়ায় স্থানীয় লোকজন বন্যার শঙ্কায় রাত জেগে ঘরের সামনে বসে থাকে।
পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম অলকা গ্রামের গত ৮ জুলাইয়ের বন্যায় বসত ঘর হারানো মাসুম চৌধুরী বলেন,আকাশে মেঘ জমলে শরীরে কাপন শুরু হয়। নদীর পাড়ে ভাঙ্গা স্থানে গিয়ে বসে থাকি। কখন আবার পানি লোকালয়ে ঢুকে আবারো নিঃস্ব করে দিয়ে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বারবার দাবি জানিয়েছি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে আমাদেরকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। মাসুম আরো বলেন বাঁধ মেরামত না হওয়ায় প্রতিটি রাত আতঙ্কে কাটতে হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদার দি নিউ ট্রেড লিংক এর স্বত্বাধিকারী তাজুল ইসলাম বলেন, পরশুরামের পশ্চিম অলকা গ্রামের মুহুরি নদীর ৮০ মিটার ভাঙ্গা বাঁধ মেরামত কাজ শুরু হয়েছিল। রাতে হঠাৎ নদীর পানি বেড়ে গিয়ে মাটি খনন যন্ত্রসহ বাঁধ মেরামতের শ্রমিকদের বিভিন্ন সরঞ্জাম পানির স্রোতে নিয়ে যায়। পানি কমে গেলে আবার বাঁধ মেরামত কাজ শুরু করবেন বলে জানান।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তার হোসেন মজুমদার বলেন, চলতি বছরের ৮ জুলাইর ভয়াবহ বন্যায় পরশুরামের ১৫টি স্থানে বাঁধ ভেঙ্গে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডেও পক্ষ থেকে ঠিকাদার নিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত কাজ শুরু করা হয়েছিল কিন্তু গত ২০ জুলাই দ্বিতীয় দফা নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বাঁধ মেরামত কাজ বন্ধ হয়ে যায়। নদীর পানি কমে গেলে আবার মেরামত কার্যক্রম শুরু করা হবে।