সেই আজিজ আবার ফেনীতে, জনমনে অসন্তোষ

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম

নিজাম হাজারীর ভাগিনা পরিচয়দানকারী আজিজুল হককে নারায়ণগঞ্জ জেলার তারাব পৌরসভা থেকে ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাকির উদ্দিনকে বদলি করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জের তারাব পৌরসভায়। 

গত বুধবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর-১ শাখার উপসচিব মো. সগীর হোসেন স্বাক্ষরিত এ আদেশ জারি করা হয়।

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তিন মেয়াদের বেশিরভাগ সময়ই ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন আজিজুল হক। সে সময়ে মেয়র পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন পদে রদবদল হলেও বহাল তবিয়তে ছিলেন ‘দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড’ খ্যাত আজিজ। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর কিছুটা বিপাকে পড়েন তিনি। অন্যত্র বদলি করা হলেও পুরোনো কায়দায় তা ঠেকিয়ে দেন। একপর্যায়ে তাকে নারায়ণগঞ্জ জেলার তারাব পৌরসভায় স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। সেখান থেকে বারবার চেষ্টা করেন ফেনীতে ফিরে আসতে। অবশেষে বুধবার ফেনী পৌরসভায় বদলির আদেশ দেওয়া হয়। এ খবর জানাজানি হলে জনমনে অসন্তোষ দেখা দেয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান চলছে বলেও জানিয়েছে পৌরসভার নির্ভরযোগ্য সূত্র।

জানা যায়, ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী পদে মো. আজিজুল হক প্রায় ২৫ বছর ধরে একই দপ্তরে কাজ করছেন। ২০০১ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে ফেনী পৌরসভায় যোগদান করেন তিনি। এরপর নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর নয় মাস নোয়াখালী পৌরসভায় চাকরি করেন। পরে তদবির করে আবারও ফেনী পৌরসভায় যোগ দেন। বারবার বদলির আদেশ হলেও ফেনী ছাড়েননি তিনি। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৫০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তিনি ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীকে মামা পরিচয় দিয়ে মেয়রসহ সবাইকে শাসিয়ে বেড়াতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তার অপকর্মের বিষয়ে কেউ কথা বলতে পারতেন না। ইতোমধ্যে তাকে কয়েকবার বিভিন্ন পৌরসভায় বদলি করা হলেও বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে অদৃশ্য খুঁটির জোরে আবার ফেনীতে ফিরে আসেন।

পৌরসভার সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, মো. আজিজুল হক দীর্ঘদিন ফেনী পৌরসভায় কর্মরত থাকায় বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির অভিযোগে সমালোচিত ছিলেন। সে সময়ের মেয়র যথাক্রমে নিজাম হাজারী, হাজী আলাউদ্দিন ও নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজীর আস্থাভাজন হওয়ায় আওয়ামী লীগের পুরো সময়জুড়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে ছিলেন তিনি। পৌরসভার বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, মেয়রদের দুর্নীতির নানা ফাঁকফোকর সম্পর্কে পরামর্শ দিতেন আজিজ। এ কারণেই তিনি ‘দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিতি পান।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, আজিজুল হক ফেনী পৌরসভায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন ২০০৭ সালে। ছয় বছর পর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে একই পৌরসভায় থেকে যান। টানা দেড় যুগ একই স্থানে থেকে পৌরসভাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতি করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ফেনীতে ফিরতে বিএনপির নেতাদের ম্যানেজ করার চেষ্টা চালিয়ে যান। জানা যায়, আজিজুল দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পৌরসভা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম জানা গেছে। একটি ‘ফ্যাক্ট ডিজাইন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট’ এবং অন্যটি ‘সয়েল টেক ডিজাইন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট’। দুটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানাই ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ার ‘মদিনা ভবন’।

সূত্র আরও জানায়, আজিজুল হক ফেনী পৌরসভায় থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভবন নির্মাণ ও সম্প্রসারণের অনুমোদন নিতে আসা ব্যক্তিদের তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করাতে বাধ্য করতেন। এজন্য নেওয়া হতো উচ্চমূল্য। মূলত নকশা তৈরি ও বাজেট প্রণয়নের কাজ তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হতো। এতে সহজেই পৌরসভার অনুমোদন মিলত। নকশা তৈরি ও বাজেট প্রণয়ন একজন স্বীকৃত প্রকৌশলীর মাধ্যমে করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিনি নিজে কাজ করে অন্য এক প্রকৌশলীর জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করতেন বলে জানা গেছে।

এছাড়া ফেনীতে কর্মরত থাকাকালে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলেন তিনি। এর মধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে দুটি ফ্ল্যাট, ফেনী শহরের মিজানপাড়ার শর্শদী হাউজে দুটি ফ্ল্যাট, ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজের পশ্চিম পাশে গোলাপবাগ সড়কের উত্তর প্রান্তে একটি বিশাল বাগানবাড়িসহ আরও অনেক সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুদক ফেনী-নোয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সূত্র জানিয়েছে, প্রকৌশলী আজিজের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

প্রকৌশলী আজিজুল হক বলেন, আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি পলাতক নিজাম হাজারী তার আপন মামা নন। এক আত্মীয়ের বন্ধু হওয়ায় তাকে মামা বলে সম্বোধন করতেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সঠিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি।

ফেনী পৌর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘যেখানে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত চলছে, সেখানে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাকে আবার ফেনী পৌরসভায় বদলির আদেশে পৌরবাসী বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। বর্তমান সরকারের আমলে কোনো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে ফেনী পৌরসভায় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত