নামের শেষ একটা সময় ‘শেখ’ পদবি ব্যবহার করতেন ফরিদপুরের ক্রিকেটার নাঈম। তবে এখন পদবি বদলে ‘ফার্স্ট নেম’টাই সামনে আনছেন, নাঈম শেখ থেকে মোহাম্মদ নাঈম নামেই নিজেকে ‘রিব্র্যান্ডিং’ করার চেষ্টা। যে চেষ্টায় ৩ বছর পর জাতীয় দলে ফের সুযোগ পেয়েছেন। ২৬ বছর বয়সী এই বামহাতি ব্যাটসম্যানের মধ্যে এখনো ভবিষ্যতের ভূত দেখছেন নির্বাচকরা, তাই তো তাকে সুযোগ দিয়েছেন শ্রীলঙ্কা সফরে আর পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে। পরখ করে দেখছেন অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে হতে যাওয়া টপ অ্যান্ড টি-টোয়েন্টি কিংবা এশিয়া কাপের জন্য। তবে প্রশ্ন হচ্ছে নাঈমের ‘বর্ণাঢ্য’ অতীতের পর আর কি কোনো ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে তার জন্য?
তামিম ইকবাল আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণেই মূলত কপাল খুলে যায় নাঈমের। সন্তানের বাবা হওয়ার অপেক্ষায় থাকা তামিম ভারত সফর থেকে সরে দাঁড়ালে তার জায়গায় বামহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে ২০১৯ সালের ভারত সফরে অভিষেক হয় নাঈমের। শুরুটা খারাপ হয়নি, অন্তত ক্যারিয়ারের তৃতীয় ম্যাচে নাগপুরে ভারতের বিপক্ষে তার ৮১ রানের ইনিংসের পরেও দল যে জেতেনি সেটার দায় পুরোপুরি মুশফিকুর রহিম-মাহমুদউল্লাহর মতো সিনিয়র ক্রিকেটারদের। তবে ক্যারিয়ারের গোড়া থেকেই নাঈমের যে সমস্যা, সেটার সমাধান ৩ বছরের বিরতিতেও হয়নি। নাঈমের সমস্যা হচ্ছে স্ট্রাইক রেট, ইনিংসের সূচনায় নেমে পাওয়ার প্লের ওভারগুলোতে খেলার সুযোগ পেয়েও তার ইনিংসগুলোতে রান হয় বলের চেয়ে সামান্য বেশি।
স্ট্রাইক-রোটেট করার সামর্থ্য কম, বাজে বলে বাউন্ডারি মারতে পারলেও ইনিংসে ডট বলের সংখ্যা থাকে বেশি। ৩ নভেম্বর অভিষেকের পর ২০২২ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলেছে ৪৩টি, যার ভেতর ৩৫টিতেই খেলেছেন নাঈম। এই সময়ে তার গড় ২৪ এর সামান্য কম, স্ট্রাইক রেট ১০৩.৪২, ৪টা হাফসেঞ্চুরি। সেগুলোও আবার শ্লথ ইনিংস, ৫২ বলে ৬২; ৫১ বলে ৬৩, ৫০ বলে ৬৪ এমন সব ইনিংস যা টি-টোয়েন্টির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বেমানান। নাঈমকে টি-টোয়েন্টিতে ধৈর্যশীল ব্যাটিং করতে দেখেই বোধহয় মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর সময়কার নির্বাচক প্যানেল তাকে টেস্ট ক্যাপও দিয়েছিল। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকেই ০ রানে আউট হয়ে তাকে সুযোগ দেওয়াটা যে বড় ভুল সেটাই প্রমাণ করেছিলেন নাঈম, পরের ইনিংসে ৯৮ বল খেলে মাত্র ১টি চার মেরে ২৪ রান করার পরও নির্বাচকদের মন আর গলেনি। এখন পর্যন্ত ‘ওয়ান টেস্ট ওয়ান্ডার’ হয়েই আছেন নাঈম।
বছর তিনেক জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করে শ্রীলঙ্কা সফর দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরেন নাঈম। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে মানসিক প্রস্তুতির অভাবে চারে নেমে ২৯ বলে ৩২*, পাকিস্তানের বিপক্ষে ইনিংসের সূচনায় নেমে ৭ বলে ৩ এবং ১৭৯ রান তাড়াতে ১৭ বলে ১০ করেছেন নাঈম। রবীন্দ্র সংগীতের আসরে কাওয়ালি যেমন বেমানান, তেমনি টি-টোয়েন্টিতেও বেমানান তার ব্যাটিং। তার ব্যাটিংয়ের ধরন এবং দর্শন কোনোটাই মেলে না এই সংস্করণের সঙ্গে। যার প্রমাণ তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুই দফাতেই রেখেছেন। এইচপির বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচেও তার রান ১১ বলে ১০।
তবুও তার ওপর আস্থা রেখে যাচ্ছেন জাতীয় দল সংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রামে চলছে বাংলাদেশ টাইগার্স আর হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের প্রস্তুতি ম্যাচ। এইচপির খেলোয়াড়দের লম্বা ক্যাম্প চলেছে চট্টগ্রামে, যদিও বৃষ্টিতে খানিকটা বিঘ্নই ঘটেছে প্রস্তুতিতে। টাইগার্স দলে আছেন জাতীয় দলের কাছাকাছি থাকা ক্রিকেটাররা। শুক্রবার চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গেছেন প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু ও বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্স চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন ফাহিম। সেখানে ফাহিম গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘এখানে এশিয়া কাপে খেলতে পারে এমন খেলোয়াড়ও আছে, নেই যে তা নয়। যদি সুযোগ পায় কারও নাম থাকতেও পারে। তবে এখানে প্রাইমারিলি আমরা ভবিষ্যতের প্লেয়ারদেরই দেখতে পাচ্ছি বিশেষ করে। আশা করছি এখান থেকে কিছু খেলোয়াড় পাব যারা হয়তো এখন জাতীয় দলে যারা আছে তাদের জায়গা নেবে।’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৬ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন নাঈম। ক্যারিয়ারের প্রথম বছর তিনেকে বাংলাদেশের খেলা টি-টোয়েন্টি ম্যাচের ৮০ ভাগ ম্যাচেই তিনি একাদশে ছিলেন, একই পজিশনে ব্যাট করেছেন। তারপর পারফরম্যান্সের অভাবে জায়গা হারিয়েছেন। ৩ বছর বিরতির পর ফিরে এসেও সেই একই দশা, মাঠ ভাড়া করে অনুশীলনের প্রভাব দেখা যায়নি মূল মঞ্চে। তারপরও যখন নাঈম এশিয়া কাপ কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় হতে যাওয়া টপ অ্যান্ড টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতার জন্য সম্ভাব্যদের তালিকায় থাকেন, তখন ধরেই নিতে হয় তার মধ্যে ভবিষ্যতের ভূতই দেখা যাচ্ছে। কারণ অতীতের চেয়ে ভালো কোনো কিছু তো তিনি করে দেখাতে পারেননি!