সুন্দরগঞ্জে তিস্তা সেতু উদ্বোধনের আগেই ঝুঁকিতে

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের চর হরিপুর এলাকায় তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে বালু। তিস্তা সেতুর মাত্র ৪/৫শ মিটার পূর্বে এসব বালু তোলা হচ্ছে। খননযন্ত্র দিয়ে তোলা সেই বালু লম্বা পাইপের মাধ্যমে ফেলা হচ্ছে তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়ক ঘেঁষে একটি জমিতে। এতে ঝুঁকিতে গাইবান্ধা-কুড়িগ্রাম জেলার সীমান্তে নির্মিত স্বপ্নের হরিপুর তিস্তা সেতু।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাজহারুল ইসলামের সহায়তায় আইন লঙ্ঘন করে সেতুর কাছ থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে বিক্রি করছে প্রভাবশালী চক্র। উদ্বোধনের আগেই ঝুঁকিতে ফেলছে তিস্তা সেতু। নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাদের।

Gaibandha 4

স্থানীয়রা জানায়, হরিপুর গ্রামের ইসমাইল পাগলা ওরফে নুর ইসলামের ছেলে গ্রাম পুলিশ মোজাহারের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর, সাইদুল, রেজাউল, ফারুক, ফুল মিয়া দীর্ঘদিন যাবত বালু তুলে জমজমাট ব্যবসা করছেন। চর এলাকা ও মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় তাদের জমজমাট বালুর ব্যবসায় কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তাদের অবৈধ বালু উত্তোলন ও ব্যবসায় সহযোগিতা করেন প্রভাবশালী একটি মহল।  

বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এর ধারা ৪-এর (খ) অনুযায়ী, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা অথবা আবাসিক এলাকা থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ।

তবে এই আইন অমান্য করে তিস্তা নদী থেকে তোলা হচ্ছে বালু। সেই সঙ্গে ভরাট করা হচ্ছে মহাসড়কের পাশে জমি।খননযন্ত্র বসিয়ে এই সেতুর উত্তর-পূর্বে প্রায় ৩০০ মিটারের মধ্যে নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু তুলছে চক্রটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সুন্দরগঞ্জ থানা পুলিশ বালু উত্তোলন বন্ধের জন্য অভিযান করে। কিন্তু তারা অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের তোপের মুখে পড়েন। পরে তারা অভিযান না করেই ফিরে আসতে বাধ্য হন। এরপর গত ৫ জুলাই কুড়িগ্রাম চিলমারীর নৌ পুলিশ ফাঁড়ি খননযন্ত্র বন্ধ করতে গিয়ে একজনকে আটক করে। কিন্তু সংঘবদ্ধ বালু উত্তোলনকারী ও তাদের বাহিনী নৌ পুলিশের ওপর হামলা করে আসামিকে ছিনিয়ে নেয়।
এ ঘটনায় চিলমারী নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত এসআই সেলিম জামান সরকার সুন্দরগঞ্জ থানায় নিয়মিত একটি মামলা করেন। মামলার ১২ জনের নাম  উল্লেখ করে ২৫/৩০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলার পর আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করে। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আবদুল হাকিম আজাদ।

শনিবার বিকালে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর নিচে উত্তর-পূর্ব পাশে নদীতে ড্রাম ও বাঁশ দিয়ে তৈরি বাল্কহেড ভাসছে। এর ওপর একটি বালু তোলার যন্ত্র (ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন) বসানো হয়েছে। সেই যন্ত্র থেকে পাইপ নদীতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। অপর পাশে পাইপ দিয়ে নদী থেকে বালু তোলা হচ্ছে। তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কের পাশে বালু স্তুপ করে রাখা হয়েছে। নদী থেকে বালু তোলার কাজ তদারকি করছেন তিন-চারজন শ্রমিক। চারপাশে পাহারা দিচ্ছেন আরও চার-পাঁচজন কর্মী।

জেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর তিস্তা সেতু প্রকল্পটির দরপত্র আহ্বান করা হয়। ১ হাজার ৪৯০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৯২৫ কোটি টাকা। চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন লিমিটেড নামে একটি চীনা প্রতিষ্ঠান এই সেতুর কাজ করে। যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য আগামী ২৫ আগস্ট তিস্তা সেতু খুলে দেওয়া হবে। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই সেতুর পাশ থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এতে সেতুটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।

অভিযোগ অস্বীকার করে হরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাজহারুল ইসলাম বলেন, নদীতে পাবলিকলি কেউ বালু তুলছে না। কেউ বালুর ব্যবসা করছে না। সরকারিভাবে এলজিইডি হয়তো বালু তুলতে পারে।

গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী জানান,সেতুর আশেপাশে থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। এতে সেতু ও সেতুর বেরি বাধ ভেঙে যেতে পারে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।