রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষক নিয়োগে জামায়াতের সাবেক এমপির সুপারিশ, ভুলে ফেসবুক স্টোরিতে দিলেন উপ-উপাচার্য

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খানের একটি ফেসবুক স্টোরি ঘিরে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগে এক প্রার্থীর প্রবেশপত্রে জামায়াত ইসলামীর সাবেক এক সংসদ সদস্যের (এমপি) সুপারিশ সম্বলিত ওই স্টোরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও উপ-উপাচার্যকে নিয়ে বিভিন্নরকম ‘ট্রল’ শুরু করেছেন।   

শনিবার (০২ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খানের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত ওই স্টোরি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে নেট দুনিয়ায়। স্টোরিতে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের জন্য আজমীরা আরেফিন নামের একজন প্রভাষক প্রার্থীর সাক্ষাৎকারের প্রবেশপত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) মো. লতিফুর রহমানের স্বাক্ষর করা সুপারিশ। সোমবার (৪ আগস্ট) সকাল ১০টায় উপাচার্যের বাসভবনের দপ্তরে স্বাক্ষাৎকার নেওয়া হবে বলে প্রবেশপত্রে বলা হয়েছে।

স্টোরিটি ভাইরাল হওয়ার কিছুক্ষণ পর উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান সেটি মুছে ফেলে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে বিষয়টির ব্যাখ্যা দেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘আমার ফেসবুক স্টোরিতে একজন আবেদনকারীর প্রবেশপত্র ভুলবশত স্টোরিতে এসে গেছে। ...প্রতিদিনই অনেক আবেদনকারী বা তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে সিভি-প্রবেশপত্র দিয়ে যায়। রুয়ার নির্বাচনের সময় একজন আলামনাস (সাবেক এমপি) ফোন করে উনার এলাকার একজন আবেদনকারীর কথা বলেন। আমার অফিস এবং ফোনে এ রকম ডজন খানেক সুপারিশ আছে। তবে এগুলো কোনোভাবেই লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় প্রভাব ফেলে না। আশা করি বিষয়টি নিয়ে কেউ ভুল বুঝবেন না। ভুলবশত এই স্টোরির জন্য দুঃখপ্রকাশ করছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মো. লতিফুর রহমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর-৩ আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে ইতিহাস বিভাগ থেকে এম. এ ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের পরপর দুইবার সভাপতি ও পরবর্তী সময়ে জামায়াত ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। তিনি রাবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের জীবন সদস্য। 

ছাত্রনেতাদের অভিযোগ, এ ঘটনা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। তাদের দাবি, এ ধরনের প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। 

মেহেদী হাসান নামের একজন ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ নামের ফেসবুক গ্রুপে লিখেছেন, ‘শ্রদ্ধেয় স্যার, কারা কারা আপনার কাছে সুপারিশ করেছে? আপনি যদি সত্যিই অসৎ না হয়ে থাকেন তাহলে তাদের নাম পরিচয় প্রকাশ করতে নিশ্চয়ই আপনার দ্বিধা থাকার কথা নয়। আর যদি সেটা প্রকাশ না করতে পারেন তাহলে তার মানে এটাই দাঁড়ায়, আপনি নিজে দুর্নীতিবাজ এবং দুর্নীতিবাজদের পাহারাদার। আপনি বিশ্বাসঘাতক। পারলে সুপারিশদাতাদের নাম পরিচয় প্রকাশ করুন।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহবায়ক ফুয়াদ রাতুল লিখেছেন, ‘চাকরি যদি জামাত নেতার রেফারেন্সেই দেন...সেক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার নাটক কেন? নাকি লিখিত পরীক্ষা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী প্রার্থীকে নকআউট করার নিঞ্জা টেকনিক?’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক গোলাম কিবরিয়া মো. মেশকাত চৌধুরী লিখেছেন,  ‘সুপারিশে আসা বাকি সমস্ত প্রবেশ পত্র পোস্ট করার দাবি জানাচ্ছি। আমরা জানতে চাই কারা এইটারে বিশ্ববিদ্যালয় না ভাইভা দলীয় গোয়ালঘর বানাতে চায়।’

উপাচার্যের নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে ধরে ছাত্রদল সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী মিথ্যাবাদী না মাননীয় উপাচার্য সালেহ হাসান নকীব স্যার?’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার লিখেন, ‘কাল রাতে আমাদের প্রো-ভিসি মহোদয়ের ছেলে ছাগলকান্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন। গেমস খেলতে গিয়ে বাবার ফোন থেকে একজন জামায়াতপন্থী সাবেক এমপির রেফারেন্সসহ প্রবেশপত্র স্টোরি দিয়ে ফেলে। স্যার ক্লারিফিকেশনে লিখলেন এমন অনেক রেফারেন্স ওনার হোয়াটসঅ্যাপ, মেইল বা সরাসরি আসে কিন্তু প্রশ্ন হলো আপনাদের কাছে রেফারেন্স দেওয়ার সাহস কেন পাবে? আপনারা কোন চেতনায় প্রশাসনে বসেছেন ভুলে গেছেন স্যার? রেফারেন্স লেটার দেওয়ার কারণে চাকরি দিব না সিদ্ধান্ত এমন হওয়া উচিত ছিল।’

সুপারিশের ব্যাপারে সাবেক এমপি মো. লতিফুর রহমান বলেন, চাকরিপ্রার্থীর প্রবেশপত্রে সুপারিশ করা হয়েছে এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তবে এটা সত্য যে ওই প্রার্থীর বিষয়ে উপ-উপাচার্যকে ফোনে সুপারিশ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি তাকে (ফরিদ উদ্দিন খান) বলেছিলাম, বিগত দিনে ভাইভাগুলোতে অনেক বাজে চর্চা হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে আমরা এটা চাই না। আপনি এই প্রার্থীর আবেদনপত্রটা দেখবেন। আবেদনকারীর বিভাগের ফলাফল অনেক ভালো।’

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে একটা পরিবর্তন আসলেও আমাদের চিন্তাগত কোনো পরিবর্তন আসেনি। সত্য কথা হচ্ছে, বিভিন্ন দপ্তরে সুপারিশ, তদবির এগুলো কোনো কিছুই বন্ধ হয়নি। এখনও দপ্তরগুলোতে শত শত তদবির জমা পড়ছে। এ ধরনের খারাপ প্র্যাকটিস আসলে কোনোটাই পাল্টায়নি, যা খুবই দুঃখজনক। তবে আমরা অন্যায় আবদার, তদবির এবং আর্থিক দুর্নীতিকে কোনো প্রশ্রয় দেব না। মানুষেরর কাজ মানুষ করবে, আমরা আমাদের মতো করে কাজ করার চেষ্টা করছি।’