ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করেছে সরকার

২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হলো আজ। এ অভ্যুত্থানের পর দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে? ওই সময় রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে গণঅভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অধ্যাপক ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ওই সময় নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। শুরুতে এ সরকার ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে। একটি বড় দলের নেতা মন্তব্য করেন, এ সরকারকে কোনোক্রমেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। কারণ এ সরকার ব্যর্থ হলে প্রকারান্তরে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটিই ব্যর্থ হবে।

৫ আগস্ট ২০২৪-এর নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে তদন্তাধীন প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে তার প্রভুর দেশ ভারতে পালিয়ে যান। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা ভারত সরকারের সহানুভূতি ও সমর্থন লাভ করেন। ভারতের সমর্থনে বলীয়ান হয়ে শেখ হাসিনা ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভয়ংকর অপপ্রচার শুরু করেন। এতে যোগ দেয় ভারতের প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলো। শুধু অপপ্রচার নয়, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য ভারতে বসে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা একের পর এক উসকানিমূলক বক্তব্য ও নির্দেশনা প্রচার করতে থাকে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রচ- বেগ পেতে হয়। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে পুলিশ বাহিনী ছিল অত্যন্ত বিপর্যস্ত। এ ধরনের একটি পুলিশ বাহিনী নিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে আসা অপপ্রচার ও উসকানিকে মোকাবিলা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। এ ছাড়া আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনে বিরাজ করছিল রাশি রাশি ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা। এদের নিয়ে সুষ্ঠু একটি প্রশাসন চালানো ছিল অচিন্তনীয় একটি চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কিছু রদবদল করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এ কথা মানতেই হবে, এ প্রয়াস কাক্সিক্ষত মাত্রার ছিল না। ফলে রাষ্ট্রবিরোধীরা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। ন্যায্য কিংবা অন্যায্য ইস্যুতে আন্দোলন, বিক্ষোভ ও ভাঙচুর চালাতে সীমান্তের ওপারের উসকানি আজও অব্যাহত আছে। সে কারণে অন্তর্বর্তী সরকার দৃঢ় হস্তে শাসন করছে বলে মনে হয় না।

এ সরকারের বড় সাফল্য ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। সরকারের সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের ফলে তলানিতে পৌঁছে যাওয়া রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীরা দেশে আইনি মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বর্তমান সরকার বিগত সরকারের আমলে নেওয়া অনেকগুলো ব্যয়বহুল প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় অংশ বাতিল করে অর্থনৈতিক সাশ্রয় করেছে। সরকার বড় বড় আকারের বিদেশি ঋণ ও অন্যান্য দায় পরিশোধ করেছে। ভেঙে পড়া অর্থনীতির ক্ষেত্রে সরকারের এ সাফল্য প্রশংসনীয়।

এ সরকারের এজেন্ডা ছিল তিনটি। এগুলো হচ্ছে আইনশৃঙ্খলার পুনরুদ্ধার; কিছু প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যত খারাপ হতে পারত, একটি গণঅভ্যুত্থানের পর বস্তুত সে রকম কিছু ঘটেনি। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ক্ষমতায় থাকতে বলেছিলেন তাদের সরকারের যদি পতন হয়, তাহলে এক রাতে পাঁচ লাখ লোক নিহত হবে। আমাদের পরম সৌভাগ্য, সে রকম কিছু হয়নি।

এ সরকারের একটি বড় সাফল্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প সরকারের পাল্টা শুল্ক আরোপের চাপ দরকষাকষি ও কূটনৈতিক আলোচনার মধ্য দিয়ে হ্রাস করতে সক্ষম হওয়া। ট্রাম্প সরকার শুরুতে ৩৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য করেছিল। আলাপ-আলোচনার পর ট্রাম্প সরকার এটি ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে সম্মত হয়। আপাতত বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেল। তবে এ কথা সত্য, বাংলাদেশকে এজন্য বড় ধরনের মূল্য দিতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সরকার তাদের যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার ফলে অর্থনৈতিকভাবে আমাদের বেশ কিছুটা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। অর্থনীতির বাইরে আর কোন কোন প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে, তা আমাদের জানা নেই।

এই মুহূর্তে সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টা হওয়া উচিত, প্রতিশ্রুত নির্বাচন ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যেই করা। কাজটি সহজ না হলেও সাধ্যাতীত নয়। আশা করব, অধ্যাপক ইউনূস সরকার যথাসময়ে নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রাকে সুগম ও সহজ করবে। কাজটি যথাযথভাবে করতে পারলে অধ্যাপক ইউনূস ও তার সরকার ইতিহাসে মর্যাদার আসনে আসীন হবে। আমরা তার সরকারের সাফল্য কামনা করি।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক