যদি জানতে চাওয়া হয় ওভাল টেস্টের রোমাঞ্চ শেষে একজন ক্রিকেটপ্রেমী হিসেবে আপনি কোন বিষয়টা মিস করছেন? নিশ্চিতভাবেই উঠে আসবে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথের কথা। সেই ২০০৭ সালে লাল বলে শেষবার মুখোমুখি হয়েছিল এশিয়ার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল। নিজ নিজ দেশের পতাকা আর বর্ণিল প্ল্যাকার্ড হাতে দুই দলের সমর্থকদের গর্জনে উন্মাতাল গ্যালারি, টিকিটের জন্য হাহাকার, আর খেলা শেষে সীমান্তের এপার কিংবা ওপারে টিভি ভাঙার শব্দে গণমাধ্যমকর্মীদের দম ফেলার সময় থাকত না। ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে কাক্সিক্ষত এই দ্বৈরথে জল ঢেলে দিয়েছে রাজনীতি। মাঠের লড়াইয়ের বদলে এখন রাজনীতির মারপ্যাঁচেই যেন রোমাঞ্চ খুঁজে ফেরে ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেটাঙ্গন। হেরে যায় ক্রিকেট, হারিয়ে যায় রোমাঞ্চ।
ভারতীয় রাজনীতিবিদ শশী থারুর বছর কয়েক আগে এক কলামে লিখেছিলেন, ‘ভারতের রাজনীতিবিদরা উপলব্ধি করেছেন যে, ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকাটা ভোটারদের মন জয় করা সহজ করে। সে কারণে ভারতীয় রাজনীতি ও ক্রিকেট আমলাতন্ত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।’ ক্রিকেটপাগলদের দেশ ভারতে ক্রিকেট ও রাজনীতির সম্পর্ক এখন এতটাই ঘনিষ্ঠতা পেয়েছে যে, দুই দেশ রাজি থাকলেও হয়তো দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজন সম্ভব নয়। এর সঙ্গে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং বাণিজ্যিক ব্যাপার-স্যাপারও জড়িত আছে। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সদ্যসমাপ্ত ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অব লিজেন্ডস (ডব্লিউসিএল) টুর্নামেন্টের দুটি ম্যাচে ভারত তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপক্ষে খেলেনি। এর পেছনে ছিল সাবেকদের নিয়ে গড়া ভারতীয় দলের স্পনসর প্রতিষ্ঠানের আপত্তি! পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ খেললে সেই স্পনসর কোম্পানি সরে দাঁড়ানোর হুমকি দিয়েছিল। এই পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়েছে গত এপ্রিলে ভারত অধ্যুষিত কাশ্মীরের পেহেলগামে জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে। ওই হামলার পর থেকে যে কোনো আসরে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে আপত্তি জানায় ভারত। ২০০৮ সালের পর থেকে আইসিসি এবং এসিসির ইভেন্টে দুই দলের লড়াই দেখা যেত। এখন তো দুই দলের মুখ দেখাদেখিই বন্ধের মুখে!
আসন্ন এশিয়া কাপেও ভারত-পাকিস্তানকে একই গ্রুপে রাখা হয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার কথা। তবে শেষ পর্যন্ত জল কোনদিকে গড়ায়, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। তাছাড়া এশিয়া কাপ নিয়েও নাটক কম হয়নি। ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সভায় সশরীরে যোগ দেয়নি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) কেউ। দেশটির বার্তা সংস্থা এএনআই জানিয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এদেশে আসতে তারা অনিরাপদ বোধ করেছে। এই ইস্যুতে শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, ওমানের মতো কয়েকটি ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের সঙ্গে সুর মিলিয়েছিল। এর আগে ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরও স্থগিত করেছিল বিসিসিআই। সরাসরি কোনো কারণ উল্লেখ না করলেও দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছিল, রাজনৈতিক কারণেই বাংলাদেশে দল পাঠাতে রাজি নয় ভারত। অর্থাৎ, এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ভারতের ক্রিকেট রাজনীতি আর পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ নেই। এতে ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশও। ব্যাট-বলের লড়াই ছাপিয়ে ক্রিকেট হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক হাতিয়ার। বাংলাদেশকেও কি সন্ত্রাসকবলিত পাকিস্তানের মতো ‘অনিরাপদ’ হিসেবে দেখাতে চায় ভারত?
ক্রিকেটীয় রাজনীতি যে শুধু উপমহাদেশের এই তিন রাষ্ট্রেই বিরাজমান, সেটা কিন্তু নয়। আফগানিস্তানে তালেবান শাসন শুরুর পর থেকে দেশটির বিপক্ষে কোনো ধরনের দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ)। তারা স্পষ্ট করে বলেছে, আফগানিস্তানে নারী নিপীড়ন ও নারী ক্রিকেট বন্ধের প্রতিবাদেই তারা দেশটির বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলবে না। এদিকে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) ওপরেও আফগানিস্তানের বিপক্ষে না খেলতে চাপ প্রয়োগ করে আসছে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনের একাংশ। তবে এখন পর্যন্ত ক্রিকেটের সঙ্গে রাজনীতি মেশাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে ইসিবি। এদিকে প্রতিবেশী দুই দেশ আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্কও তলানিতে। প্রায়ই দুই দেশের সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতেও অবশ্য থেমে নেই তাদের ক্রিকেটীয় লড়াই। তবে সাম্প্রতিক অতীতেই স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়ে দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
এশিয়ার বাইরে তাকালেও ক্রিকেটে এমন রাজনৈতিক দ্বৈরথের খোঁজ পাওয়া যায়। ঐতিহ্যবাহী অ্যাশেজ সিরিজের গোড়াপত্তন হয়েছিল তো এভাবেই। এক সময় অস্ট্রেলিয়া ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অবশ্য তাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ করেনি। বরং ১৮৮২ সালে জন্ম দিয়েছে অ্যাশেজ সিরিজের মতো রোমাঞ্চকর টেস্ট লড়াইয়ের। অ্যাশেজ শুরু হওয়া মানে দুই দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে যেন যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ‘অ্যাশেজ’ নামটাই তো এসেছে এই রাজনৈতিক দ্বৈরথের প্রভাবেই। তবে শতাব্দী প্রাচীন সেই যুদ্ধে এখন আর রাজনীতির আঁচ নেই। সেটা ব্যাট-বল আর কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।
ভারতের সঙ্গে লড়াই দিয়েই ১৯৫২ সালে শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের টেস্ট যাত্রা। পাকিস্তান এখন পর্যন্ত যে ৪৬৫ টেস্ট খেলেছে তার ৩৮টি ভারতের সঙ্গে। সর্বশেষ ২০০৭ সালে ভারতের মাটিতে তিন ম্যাচের সিরিজ খেলেছিল পাকিস্তান। ২০০৯ সালে লাহোরে শ্রীলঙ্কা দলের টিম বাসে বোমা হামলার পর থেকে দুদেশের মধ্যে ক্রিকেট শুধু বৈশ্বিক সাদা বলের টুর্নামেন্টে সীমিত হয়ে যায়। এমনকি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৯ সাল থেকে শুরু হলেও সেখানে সচেতনভাবে ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
অথচ ভারত-পাকিস্তানের টেস্ট সিরিজও হতে পারত ‘এশিয়ার অ্যাশেজ’। দুই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা রোমাঞ্চ ছড়াতে পারত ক্রিকেটের বাইশ গজে। আজকাল অন্য কোনো দেশকে ‘হোম ভেন্যু’ বানিয়ে খেলা তো ডালভাত হয়ে গেছে। আফগানিস্তান যেমন ভারত ও দুবাইকে হোম ভেন্যু বানিয়ে খেলে। ২০০৯ সালে লাহোরে শ্রীলঙ্কা দলের টিমবাসে বোমা হামলার পর এক দশকের বেশি সময় পাকিস্তানও সংয্ক্তু আরব আমিরাতকে হোম ভেন্যু বানিয়ে খেলেছে। ভারত চাইলে নিরপেক্ষ ভেন্যুতেও হতে পারে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ। ‘ভারত চাইলে’ লেখা হয়েছে কারণ, ক্রিকেট বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় তীর্থভূমি ভারতের চাওয়ার ওপরেই অনেক কিছু নির্ভর করে। তাই আইসিসিও ভারতকে নিয়ে কখনই ঘাঁটায় না। তাই রোহিত শর্মা, শোয়েব আখতার, বাবর আজম কিংবা বিরাট কোহলিদের মতো কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর চাওয়া ভারত-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজন সুদূর পরাহতই থেকে যায়। ক্রিকেটীয় রোমাঞ্চ বিলীন হয়ে যায় রাজনীতির অতল গহ্বরে।