খরার থাবায় বাড়ছে গাছের মৃত্যু, হুমকিতে পৃথিবীর শ্বাস

গাছের ওপর খরার প্রভাব নিয়ে করা বৈশ্বিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, খরার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে গাছের মৃত্যু বাড়বে, যা পৃথিবীকে আরও উষ্ণ করে তুলবে এবং পরিবেশ ও জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া পৃথিবীর উষ্ণতা ঠেকাতে বর্তমানে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, খরায় গাছের মৃত্যু সেই সংকট মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলবে। 

এই গবেষণা নিবন্ধটি গত ৩১ জুলাই বিজ্ঞান বিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ ‘উষ্ণমণ্ডলীয় গাছের কাণ্ডের বৃদ্ধিতে খরার প্রভাব সামান্য’ শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের ওয়াগেনিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার জুইডেমা, ব্রাজিলের ইউনিভার্সিটি অব ক্যাম্পিনাসের অধ্যাপক পিটার গ্রোয়েনেন্ডি, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক মিজানুর রহমান, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার অধ্যাপক ভেলেরি ট্রাউট ও অধ্যাপক ফ্লোরিন বাবস্ট। তাদের সঙ্গে আরও ১৫১ জন সহগবেষক কাজ করেছেন। 

গবেষকেরা ১৯৩০ সাল থেকে প্রায় ১০০ বছরের সময়কালে ৩৬টি দেশের ৫০০টি স্থানের ২০ হাজারের বেশি গাছের বর্ষবলয়ের তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন। আমাজন বন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের গাছের তথ্যও এতে অন্তর্ভুক্ত। গবেষকদের দাবি, এর আগে এত বড় পরিসরে গাছের বর্ষবলয় নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি।

উল্লেখ্য, বয়স্ক গাছকে আড়াআড়িভাবে করাত দিয়ে কাটলে ভেতরে গাঢ় রঙের চাক চাক দাগ দেখা যায়, যাকে গাছের বর্ষবলয় বা ট্রি রিংস বলা হয়। এগুলো গুনে গাছের বয়স নির্ধারণ করা যায়।

গবেষণায় দেখা যায়, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে খরার বছরে গাছের বৃদ্ধি স্বাভাবিক বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ কম ছিল, তবে পরবর্তী বছরে তা অনেকটাই পূরণ হয়ে যায়। খরার প্রভাব সামান্য হওয়ার কারণ হিসেবে গবেষকেরা বলেছেন, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন কার্বন শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে খরার পরও প্রকৃতিতে এর প্রভাব কম দেখা গেছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে এবং খরাও বাড়ছে, ফলে গাছের কার্বন শোষণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে কমে আসছে। 

গবেষকেরা আরও জানান, খরার বছরে গাছের বর্ষবলয় স্বাভাবিক বছরের তুলনায় কতটা সংকুচিত হয়েছিল তা তারা পরিমাপ করেছেন। পাশাপাশি খরার পরবর্তী দুই বছরে বর্ষবলয়ের প্রস্থও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, খরার প্রভাবে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ০.১ শতাংশ গাছ মারা যেতে পারে। সংখ্যাটি কম মনে হলেও, এটি জার্মানির মতো একটি প্রধান শিল্পোন্নত দেশ বছরে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে তার সমান। এর ফলে দুটি বিষয় ঘটবে-প্রথমত, মৃত গাছ যে পরিমাণ কার্বন শোষণ করত, সেই পরিমাণ কার্বন প্রকৃতিতে থেকেই যাবে। দ্বিতীয়ত, পচে যাওয়া গাছ থেকে অতিরিক্ত কার্বন নির্গত হবে।

গবেষক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন পর্যন্ত গাছের কাণ্ড বৃদ্ধি ও কার্বন শোষণে খরার প্রভাব সীমিত পর্যায়ে আছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যাবে।