দেশে মোট চাহিদার মাত্র ৫-৭ শতাংশ চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও যন্ত্রপাতি দেশে উৎপাদন হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর মেডিকেল ডিভাইসেস অ্যান্ড সার্জিকেল ইন্সট্রুমেন্টস ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স (বিএএমডিএসআইএমই)।
সংগঠনের নেতারা বলেছেন, সম্ভাবনাময় একটি খাত হওয়া স্বত্তেও এই শিল্পের বিকাশ হচ্ছে না। আমদানিনির্ভর পরিকল্পনার অভাবে নষ্ট হচ্ছে সকল সম্ভাবনা। দেশে চাহিদার ৮৫-৯০ শতাংশ মেডিকেল ডিভাইস যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীনসহ নানা দেশ থেকে আমদানি করে সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫-৭ শতাংশ। এর ফলে বিদেশি মুদ্রার ওপর চাপ পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার উপর আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে।
আজ রবিবার রাজধানীতে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টারস ফোরামের (বিএইচআরএফ) সঙ্গে এক মতবিনিময়সভায় এই তথ্য জানায় বিএএমডিএসআইএমই। পরীবাগে সংগঠন কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় দেশে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও যন্ত্রপাতি শিল্পের সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন বিএএমডিএসআইএমই'র সভাপতি মো. আবদুর রাজ্জাক।
এ সময় মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দেশে বর্তমানে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও যন্ত্রপাতির বাজারের আকার প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা, যা প্রতিবছর গড়ে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। দেশের প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে এই শিল্পের বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর অর্থ হলো, শুধু স্থানীয় চাহিদা পূরণই নয়, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে আমরা বৈদেশিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিতে পারব।
এই উৎপাদক আরও বলেন, ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা ইমেজিং মেশিন, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম, হাসপাতালে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম, সিরিঞ্জ, স্যালাইন সেট, সুরক্ষা পোশাক- আধুনিক চিকিৎসার জন্য এসব অপরিহার্য। কিন্তু এসবের ৮৫-৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিলে দেশের স্বাস্থ্যসেবা সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে। অথচ আমরা চাইলে অনেক পণ্য দেশে উৎপাদন করতে পারি।
সভায় জানানো হয়, দেশে চিকিৎসা সরঞ্জাম শিল্পের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৫ সালে অপসো স্যালাইন এবং ১৯৯৯ সালে জেএমআই সিরিঞ্জ অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইস প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এর পর আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন অর্জন করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি সিরিঞ্জ, স্যালাইন সেট, রক্ত পরিবহন টিউব, পিপিইসহ নানা পণ্য ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার ৪০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
সভায় এই শিল্পের অগ্রগতির পথে নানা ধরণের বাঁধা তুলে ধরেন এসব পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। তারা জানান, নীতি সহায়তার অভাব, উৎপাদন উপযোগী কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক, গবেষণা ও উদ্ভাবনে সীমিত বিনিয়োগ, খণ্ডিত বাজার কাঠামো, সঠিক পরিসংখ্যান ও তথ্যের অভাব এবং শুল্ক জালিয়াতি- এসব সমস্যার কারণে দেশীয় উৎপাদন সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। এ খাতে সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশ কেবল আমদানিনির্ভরতা কমাতে পারবে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
সভায় সংগঠনটি কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। যেমন- চিকিৎসা সরঞ্জাম শিল্পে কর অবকাশ (ট্যাক্স হলিডে) সুবিধা প্রদান, রপ্তানি প্রণোদনা ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ২০ শতাংশ করা এবং ন্যূনতম ১০ বছর বহাল রাখা, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে বিশেষায়িত পাঠ্যক্রম চালু, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও শল্যচিকিৎসা যন্ত্র খাতকে পৃথক শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি ও নীতি সহায়তা প্রদান, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অধীনে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা, সরকারি ক্রয়ে দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং দেশে উৎপাদনযোগ্য পণ্যের আমদানি বন্ধ করা, চিকিৎসা সরঞ্জাম রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা চালু এবং দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য সমন্বয় না হওয়ায় উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত- এই অবস্থা পরিবর্তনে দ্রুত মূল্য সমন্বয়।
সভায় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান গেটওয়ে'র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (বিজনেস) সাঈদ হোসেন চৌধুরী, এএনসির ডা. মোহাম্মদ সেলিম, বিএইচআরএফ সভাপতি রাশেদ রাব্বি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।