নেই যুদ্ধবিরতি, হয়নি কোনো চুক্তি

আলাস্কা বৈঠক কী ‘শান্তির দূত’ ট্রাম্পের সুনাম ক্ষুণ্ণ করল?

কোনো যুদ্ধবিরতি কিংবা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে আলাস্কার আঙ্কোরেজে অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক। তিন ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনার পর দুই নেতা সাংবাদিকদের সামনে একটি যৌথ বিবৃতি দিলেও কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই স্থান ত্যাগ করেন। সম্মেলনের পর, এখন প্রশ্ন উঠছে—এটি আদৌ কী ফলপ্রসূ হলো?

আঙ্কোরেজে অনুষ্ঠিত বৈঠক কভার করতে থাকা বিবিসির তিনজন সংবাদদাতা বিশ্লেষণ করেছেন—এই বৈঠক যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার দুই নেতার জন্য কী অর্থ বহন করে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে।

‘ডিলমেকার’ হিসেবে ট্রাম্পের খ্যাতিতে আঘাত

‘চুক্তি তখনই চুক্তি, যখন সেটা চূড়ান্ত হয়’, আলাস্কায় বৈঠকের পর দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন, দীর্ঘ আলোচনার পরেও কোনো চুক্তি হয়নি, হয়নি কোনো যুদ্ধবিরতিও। বলার মতো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতিও নেই।

যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে ‘কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হয়েছে। কিন্তু সেটি কী ধরনের অগ্রগতি, সে বিষয়ে তেমন কোনো বিশদ বিবরণ না দেওয়ায় তা এখন বিশ্ববাসীর কল্পনার ওপরই নির্ভর করছে।

এছাড়া সাংবাদিকদের প্রশ্ন উপেক্ষা করে মঞ্চ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা সেখানে পৌঁছাতে পারিনি।’

এই পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্প এত দূর ভ্রমণ করে এসেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিয়েছেন শুধু কিছু অস্পষ্ট মন্তব্য। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্র ও ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা স্বস্তি পেতে পারেন যে, তিনি কোনো একতরফা ছাড় বা এমন কোনো চুক্তি দেননি যা ভবিষ্যতের আলোচনাকে দুর্বল করে দিতে পারত।

নিজেকে ‘শান্তির দূত’ এবং ‘চুক্তির মানুষ’ হিসেবে তুলে ধরলেও, এই বৈঠকের পর ট্রাম্প সেই ভাবমূর্তিকে ধরে রাখতে পারলেন না। আলাস্কা থেকে ফিরে গেলেন—না শান্তি, না কোনো চুক্তি নিয়ে।

আগামী দিনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে নিয়ে কোনো শীর্ষ বৈঠক হবে—এমন কোনো ইঙ্গিতও পাওয়া যায়নি। যদিও পুতিন পরবর্তী বৈঠক নিয়ে রসিকতা করে বলেছেন, ‘পরেরবার মস্কোতে।’

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প রাশিয়াকে নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছিলেন। এই আলোচনায় ইউক্রেন বা রাশিয়ার তুলনায় ট্রাম্পের ঝুঁকি কম থাকলেও, বৈঠক নিয়ে আগের আশাবাদী বক্তব্য—যেখানে তিনি বলেছিলেন ব্যর্থতার সম্ভাবনা মাত্র ২৫%— কিন্তু এই ফলাফলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ট্রাম্পের সুনামকে ক্ষুণ্ণ করবে।

তারও চেয়ে বিব্রতকর, যখন পুতিন সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে দীর্ঘ উদ্বোধনী বক্তব্য দেন, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নীরব দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। এটি ছিল হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসের সাধারণ রীতির এক বিপরীত দৃশ্য, যেখানে সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্ট কথার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন এবং বিদেশি নেতারা চুপচাপ তা শোনেন।

আলাস্কা যদিও মার্কিন ভূখণ্ড, তবুও পুতিন যেন নিজ ঘরেই ছিলেন— ঊনিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি হওয়ার আগের ইতিহাস টেনে যে অঞ্চলকে তার কর্মকর্তারা এখনো ‘রাশিয়ান আমেরিকা’ বলে উল্লেখ করতে পছন্দ করেন। এই বিষয়টি আগামী দিনগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের গায়ে লেগে থাকতে পারে, যেমনটা থেকে যাবে সংবাদমাধ্যমের সে সব প্রতিবেদন, যেখানে এই সম্মেলনকে ব্যর্থ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যা শুক্রবার সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করতে পারেননি— শাস্তি হিসেবে ট্রাম্প কি শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার বিরুদ্ধে তার বহুবার হুমকি দেওয়া নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর করবেন?

এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফ্লাইটে ওঠার আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বন্ধুসুলভ সাক্ষাৎকারে আংশিকভাবে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, ‘হয়তো দুই সপ্তাহ, তিন সপ্তাহ পর বিবেচনা করব।’

কিন্তু তিনি তো আগেই বলেছিলেন, যদি রাশিয়া যুদ্ধবিরতির পথে না আসে, তাহলে ‘কঠোর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে। সেই বিবেচনায় এত অস্পষ্ট উত্তর বরং উত্তর দেওয়ার চেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করছে।

বিশ্বমঞ্চে পুতিনের শক্ত অবস্থান

যেখানে কোনো প্রশ্নোত্তর নেই, সেটি কি আদৌ সংবাদ সম্মেলন? পুতিন ও ট্রাম্প যৌথভাবে বিবৃতি দেওয়ার পর মঞ্চ ত্যাগ করেন—একটি প্রশ্নও নেননি তারা। মার্কিন ও রুশ প্রতিনিধিরাও সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই দ্রুত হল ত্যাগ করেন।

এর মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়—ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে দুই নেতার দৃষ্টিভঙ্গিতে এখনো গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্প যেখানে যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দিচ্ছেন, পুতিন তাতে সাড়া দেননি।

যদিও দিনের শুরুতে ট্রাম্প পুতিনকে ‘সম্মানিত অতিথি’ হিসেবে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেন, পুতিন সেই সৌজন্যের সুযোগ নিয়ে বিশ্বমঞ্চে আবারও শক্ত অবস্থান তুলে ধরলেন।

অবশ্য, এখন প্রশ্ন হচ্ছে— কিন্তু ট্রাম্প কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন? যেহেতু এখনো পর্যন্ত তিনি পুতিনকে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য রাজি করাতে সক্ষম হননি।

ট্রাম্প কী এবার সত্যিই তার হুমকি অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন? বৈঠকের আগে তিনি যুদ্ধবিরতির আহ্বান উপেক্ষা করলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার হুমকি, সময়সীমা এবং আরও নিষেধাজ্ঞার সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করেননি। তিনি কি করবেন সেটিও স্পষ্ট নয়।

ইউক্রেনের স্বস্তি, কিন্তু আশঙ্কাও রয়ে গেল

আঙ্কোরেজ বৈঠক হয়তো অনেকের কাছেই হতাশাজনক মনে হতে পারে, তবে কিয়েভে এই খবর কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়েছে হয়তো— কারণ কোনো এমন চুক্তি হয়নি, যা ইউক্রেনের ভূখণ্ডকে ঝুঁকিতে ফেলত।

তবে ইউক্রেনের জনগণ জানে—রাশিয়ার সঙ্গে করা অতীতের প্রতিটি চুক্তিই শেষ পর্যন্ত ভঙ্গ হয়েছে। ফলে আজ যদি কোনো চুক্তিও হতো, তাতেও তারা খুব একটা আশ্বস্ত হতো না।

তবে ইউক্রেনীয়দের উদ্বিগ্ন, গণমাধ্যমের সামনে যৌথ বক্তব্যে ভ্লাদিমির পুতিন আবারও সংঘাতের ‘মূল কারণ’ নিয়ে কথা বলেছেন এবং বলেছেন, শুধু সেই কারণগুলো দূর হলে টেকসই শান্তি আসবে।

ক্রেমলিনের ভাষায় এর অর্থ, তিনি এখনো তার ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ এর মূল লক্ষ্যে অটল— যা হলো ইউক্রেনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভেঙে দেওয়া। পশ্চিমা দেশগুলোর সাড়ে তিন বছরের প্রচেষ্টা পুতিনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাতে পারেনি এবং এখন সেটি আলাস্কা বৈঠকেও প্রযোজ্য।

এই শীর্ষ বৈঠকের পর সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা রয়ে গেল—এখন কী হবে? রাশিয়ার হামলা কি অব্যাহত থাকবে?

গত কয়েক মাসে একের পর এক পশ্চিমা সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছে রাশিয়া। ইউক্রেনীয়রা আশঙ্কা করছেন—আলাস্কা সম্মেলন থেকেও পুতিন হয়তো সেই বার্তাই নিয়েছেন যে, তিনি আক্রমণ অব্যাহত রাখতে পারেন।