২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর নিহত প্রতিটি ইসরায়েলির বিনিময়ে ৫০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করার কথা বলেছেন দেশটির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আমানের সাবেক প্রধান আহারন হালিভা। এ মৃতের সংখ্যা ভবিষ্যত ফিলিস্তিনি প্রজন্মের জন্য একটি ‘বার্তা’ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন তিনি।
ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এ সম্প্রচারিত একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে আহারন হালিভাকে এসব কথা বলতে শোনা যায়। এর আগে ‘৭ অক্টোবর হামাসের হামলা’ প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণে গত বছর পদত্যাগ করেছিলেন আহারন হালিভ।
অডিওতে হালিভাকে বলতে শোনা যায়, ‘ফিলিস্তিনিরা সময় সময় নকবা (এর অর্থ দুর্যোগ, যা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের দেশত্যাগকে বোঝানো হয়)-এর সম্মুখীন হতে হবে এবং গাজায় মৃত্যুর হার দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন।’
‘গাজায় ইতোমধ্যে ৫০ হাজার নিহত হওয়ার বিষয়টি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য,’ বলেন আহারন হালিভা।
উলপান শিষি নামক টিভি অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত অডিও রেকর্ডিংয়ের তারিখ প্রকাশ করেনি চ্যানেল ১২। তবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী ইসরায়েলের গণহত্যায় গাজায় মৃতের সংখ্যা মার্চে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং বর্তমানে তা ৬১ হাজার ৮৯০ ছাড়িয়েছে।
২০২৩ সালে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার প্রসঙ্গে হালিভা বলেছেন, ‘৭ অক্টোবরের প্রতিটি (ইসরায়েলি) নিহতের বিনিময়ে ৫০ জন ফিলিস্তিনিকে মারা হবে। তাদের মাঝে নকবা দরকার, যাতে তারা এর পরিণতি বুঝতে পারে।’
হালিভা আরও বলেন, ‘আমি এটি প্রতিশোধের মনোভাব থেকে বলছি না, এটি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি বার্তা।’
তিনি গাজাকে ‘একটি অশান্ত প্রতিবেশ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় কতজন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন তা স্পষ্ট নয়, তবে ইসরায়েলি সামরিক সূত্রে জানা গেছে অন্তত ১ হাজার ১৯৫ জন নিহত হয়েছিলেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম হারেৎজ অনুসারে, ওইদিন ইসরায়েলি সেনারা ‘হ্যানিবাল নির্দেশিকা’ ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করে, যা ইসরায়েলি সৈন্যদের অপহরণ রোধে যে কোনো প্রয়াস গ্রহণের নির্দেশ দেয়, এমনকি তাদের হত্যা করলেও।
রেকর্ডিংয়ে হালিভা আরও বলেন, ইসরায়েল পশ্চিম তীরের রাজনৈতিক পরিবেশ এমন করে তুলতে চায় যাতে হামাসের মত সংগঠনগুলো ক্ষমতায় আসতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এড়াবে, ফলে দুই রাষ্ট্র সমাধানের ধারণা ধ্বংস হয়ে যাবে।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধে হামাস ধ্বংসের একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু ইসরায়েলি কর্মকর্তারা তা বাস্তবায়নের ইচ্ছা প্রকাশ করেননি।
‘বুঝুন, এখানে অনেক গভীর বিষয় রয়েছে। ইসরায়েলি-ফিলিস্তিন সংঘাতের মূল বিষয় হল, হামাস ইসরায়েলের জন্য ভালো— এটা (অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের) যুক্তি,’ হালিভা বলেন। তিনি জানান, ওই মন্ত্রী চায় প্যালেস্টাইনিয়ান কর্তৃপক্ষকে ধ্বংস করে পশ্চিম তীরেও হামাসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে, যেমন গাজায় হয়েছে।
‘কেন? কারণ যদি পুরো ফিলিস্তিন অঙ্গন বিশৃঙ্খল ও অস্থির হয়, তাহলে কোনো আলোচনা সম্ভব হবে না,’ তিনি বলেন। ‘তাহলে কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চুক্তি হবে না।’
তিনি বলেন, ‘হামাস একটি সংগঠন, যার বিরুদ্ধে আপনি মুক্তভাবে লড়াই করতে পারেন, যার কোনো আন্তর্জাতিক বৈধতা নেই, কোনো বৈধ অধিকার নেই, তাই তাকে তরবারির সাহায্যে লড়াই করা যায়।’
হামাস ও ইসরায়েল জানুয়ারিতে একটি সংক্ষিপ্ত তিন ধাপের যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে পৌঁছেছিল। কিন্তু মার্চে ইসরায়েল কয়েকজন বন্দিকে মুক্ত করার পর আবার গাজায় বোমা বর্ষণ শুরু করে এবং চুক্তি ভঙ্গ করে, হামাসের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই চুক্তি থেকে সরে আসে।
তারপর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইসরায়েলকে পুরোপুরি সমর্থন দিয়ে গাজায় যুদ্ধ চালাতে সাহায্য করেছে।
৭ অক্টোবর ২০২৩-এর হামলার পর থেকে ইসরায়েল গাজায় ধারাবাহিক বোমা হামলা চালিয়ে আসছে। ২৩ লাখেরও বেশি বাসিন্দাকে বাস্তুচ্যুত এবং ৬১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বেশিরভাগই নারী ও শিশু, হত্যা করেছে।