সার্কভুক্ত খেলোয়ার নেওয়ায় বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতির অঙ্ক মিলবে তো

সদ্য সমাপ্ত দলবদলে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলারদের জন্য দুয়ার উন্মোচন করে দিয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। দক্ষিণ এশিয়া থেকে সর্বোচ্চ পাঁচজন ফুটবলারকে স্থানীয় হিসেবে চুক্তিবদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছিল শীর্ষ ক্লাবগুলো। ব্রাদার্স ইউনিয়ন, পুলিশ এফসি, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, ফর্টিস এফসি ও রহমতগঞ্জ ১১ ফুটবলারকে স্থানীয় হিসেবে নিয়েছে। এর মধ্যে নেপালের আছেন ৮ ফুটবলার। একজন করে এসেছেন ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ভুটান থেকে। কোটা সর্বোচ্চ ৫০। সেখানে ১১ সংখ্যাটা সহনীয় পর্যায়ে। তবে সব ক্লাব সুযোগের সেরা ব্যবহার করলে স্থানীয়দের খেলার সুযোগ আরও কমত। সাফের বিকেন্দ্রীকরণের ডাকে সাড়া দিয়েছে শুধু বাংলাদেশ। বাকিদের খুব বেশি হেলদোল নেই। তাতে দেশের খেলোয়াড়রা হচ্ছেন বঞ্চিত। বাফুফের সিদ্ধান্তও হচ্ছে প্রশ্নবিদ্ধ।

এ নিয়মের ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল শুরু থেকেই। বাফুফে কর্তাদের দাবি ছিল, এতে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সামনে খুলবে বাইরের দরজা। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে মানের দিক থেকে সবার ওপরে ভারতের আইএসএল। এরপরেই বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ। গুণ-মান, অর্থ-বিত্ত সব দিক থেকেই নেপাল, মালদ্বীপ, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে বাংলাদেশ। ভারত ও বাংলাদেশ বাদে অন্য দেশগুলো তো ঠিকঠাক লিগই আয়োজন করতে পারে না।

বেতন বিবেচনায় বাংলাদেশের শীর্ষ ফুটবলারদের জন্য লাভজনক হবে শুধু ভারত। অথচ ভারত এখনো হাঁটেনি বাংলাদেশের পথে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে সর্ব ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভায় বিষয়টি গুরুত্ব নিয়ে আলোচিত হয়েছিল। তবে হয়নি কোনো সিদ্ধান্ত। আবার ভারত সিদ্ধান্ত নিলেও বাংলাদেশের ফুটবলারদের প্রতি আগ্রহ দেখাবে কি না, তা নিয়েও আছে প্রশ্ন।

এ মৌসুমে সর্বোচ্চ চারজন সার্কভুক্ত খেলোয়াড় নিয়েছে ব্রাদার্স। চারজনই নেপালের শীর্ষ খেলোয়াড়-অঞ্জন বিস্তা, জোগেশ গুড়ং, সানিশ শ্রেষ্ঠা ও আরিক বিস্তা। ক্লাবটির ম্যানেজার আমের খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি মনে করি এটা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছি শুধু ক্লাবের স্বার্থে। তবে সামগ্রিকভাবে দেশের ফুটবলের জন্য ভালো হয়নি। এতে স্থানীয়দের খেলার সুযোগ কমবে।’ নেপালের গোলরক্ষক ও অধিনায়ক কিরন কুমার লিম্বু ও তরুণ ফরোয়ার্ড আয়ুশ ঘালান এবং ভুটানের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ওয়াংচুক থেসেরিংকে নিয়েছে পুলিশ এফসি। ক্লাবের ম্যানেজার, ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বলেছেন, ‘এর ইতিবাচক দিক হলো খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নিয়ে বিরাজমান অস্থিরতা অনেকটা কমবে। বাইরে থেকে আমরা কম টাকায় আমাদের জাতীয় দল মানের খেলোয়াড় নিতে পারছি। এবার আমরা কাজেম শাহ ও আল-আমীনকে ছেড়ে দিয়েছি চড়া পারিশ্রমিকের কারণে। তাদের দুজনের টাকা দিয়ে তিন দক্ষিণ এশীয় ও এক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারকে নিয়েছি। আবার এর বিপরীত দিকও আছে। এই সিদ্ধান্তে স্থানীয়দের খেলার সুযোগ কমেছে। এবার মাত্র ১১ জন সুযোগ পেয়েছে। ক্লাবগুলো সুবিধার দিকটা বুঝে গেলে ভবিষ্যতে হয়তো সংখ্যা অনেক বাড়বে। তখন দেশের তরুণদের খেলার সুযোগ কমবে। বাংলাদেশের ফুটবলারদের দর আকাশচুম্বি। এ কারণেই ভারত ছাড়া অন্য দেশের ক্লাবগুলোর জন্য তারা সামর্থ্যরে বাইরে। আবার অনেক দেশে নিয়মিত লিগ হয় না। সব মিলিয়ে এর লাভ-ক্ষতি সময়ই বলে দেবে।’ ফর্টিস এফসি শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলের অধিনায়ক ও গোলকিপার সুজান পেরেরা ও নেপালের স্টপার ব্যাক অনন্ত তামাংকে নিয়েছে। আরামবাগ নিয়েছে ভারতের প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী ও রহমতগঞ্জে খেলবেন নেপালের অভিষেক লিম্বু।

নেপালিদের জন্য এবারের লিগ বড় সুযোগ হয়ে ধরা দিয়েছে। নেপালের সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক প্রজ্জ্বল ওলি এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন দেশ রূপান্তরের কাছে, ‘নেপালে গত বছর লিগ হয়নি। শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় দুই ডজন খেলোয়াড় জীবিকা বদলে অস্ট্রেলিয়া স্থায়ী হয়েছেন। বাকিরা বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন নিয়মিত খেলার সুযোগ পেতে এবং ভালো পারিশ্রমিকের আশায়। নেপালে লিগ শুরু হলে হয়তো তারাও বাংলাদেশের পথে হাঁটবে।’

মালদ্বীপও হাঁটছে না বাংলাদেশের দেখানো পথে। সে দেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম মিহারু নিউজের ক্রীড়া সাংবাদিক হুসাইন হাবিব ওজনে তুলে ধরেছেন সে দেশের স্থানীয় লিগের চিত্র, ‘এখানে প্রায় দেড় বছর কোনো লিগ হয়নি। আগামী মাস থেকে লিগ শুরু হবে। তবে বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশীয়দের কোনো সুযোগ রাখেনি মালদ্বীপ ফুটবল ফেডারেশন। এখানে চারজন বিদেশির মধ্যে একজন এশীয় বাধ্যতামূলক। দক্ষিণ এশীয়দের নিয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’

শ্রীলঙ্কা ফুটবল ফেডারেশনের মিডিয়া ম্যানেজার নাভোদ বিজয়বিক্রমা, পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশনের মিডিয়া অফিসার মুহাম্মদ ইয়াসাল মাজহার ও ভুটান ফুটবল ফেডারেশনের মিডিয়া অফিসার প্রাণিত কাটওয়াল জানিয়েছেন তাদের ফুটবল কর্তাদের এ নিয়ে কোনো হেলদোল নেই। তাই বাংলাদেশের এ সিদ্ধান্ত ফলপ্রসূ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।